সাইফুল ইসলাম মাসুম
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে একটি দীর্ঘ ছায়া আজ নিঃশেষ হলো। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেন অনন্তলোকে। কিন্তু রেখে গেলেন এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হওয়ার বদলে আরও গভীর ও তাৎপর্যময় হয়ে উঠবে। ইতিহাসের বিচারে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের জীবন কেবল স্মৃতির বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য এক স্থায়ী পাঠ্য। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ঠিক তেমনই এক অনিবার্য পাঠশালা।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই নেত্রীর রাজনৈতিক পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। প্রায় ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে প্রায় ৩৩ বছর কেটেছে নিরন্তর সংগ্রাম, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। কারাবরণ, হয়রানি, নিপীড়ন, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার এমন কোনও অধ্যায় নেই, যা তাকে স্পর্শ করেনি। তবু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এসব কিছুই তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি প্রতিকূলতা তাকে আরও দৃঢ়, আরও অনমনীয় করে তুলেছে।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও আপোষহীন। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আধিপত্যবাদ ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি ছিলেন নির্ভীক। ক্ষমতার সুবিধাবাদ কিংবা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য তিনি কখনোই নিজের অবস্থান বিসর্জন দেননি। এই অনড়তা তাকে বিতর্কিত করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়, যা আজকের প্রেক্ষাপটে বিরল।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার মানসিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক ধৈর্য। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির কঠিন পরীক্ষায় টিকে থাকার জন্য যে সহিষ্ণুতা ও আত্মসংযম প্রয়োজন, তা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন। ব্যক্তিগত আচরণ ও রাজনৈতিক ভাষায় তিনি ছিলেন সংযত ও পরিশীলিত। রাজনৈতিক বিরোধ যত তীব্রই হোক, শিষ্টাচার ও মর্যাদাবোধের সীমারেখা তিনি সচেতনভাবেই বজায় রেখেছেন- যা বর্তমান রাজনীতিতে ক্রমশ বিলুপ্তপ্রায় এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
এই কারণেই জনসমর্থনের প্রশ্নে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক রাজনৈতিক শক্তি। জনপ্রিয়তা তার কাছে কোনও হঠাৎ প্রাপ্ত উপহার ছিল না; বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আপোষহীন অবস্থানের ফল। ‘আপোষহীন দেশনেত্রী’ অভিধাটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সারসংক্ষেপ।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে, তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বহু মানুষের আশা, বিশ্বাস ও প্রতিবাদের প্রতীক। ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, কিছু নেতা মৃত্যুর পর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, কারণ তখন তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তি নয়, প্রতীকে রূপ নেয়। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো- আমাদের রাজনীতিবিদরা তার জীবন ও রাজনীতি থেকে কী শিক্ষা নেবেন? রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে খালেদা জিয়ার চরিত্রের মৌলিক উপাদানগুলো- নৈতিক দৃঢ়তা, আপোষহীনতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও শিষ্টাচার আত্মস্থ করা ছাড়া বিকল্প নেই। বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি দায়িত্বশীল ও পরিণত রাজনৈতিক ধারার জন্য এসব গুণ অপরিহার্য।
খালেদা জিয়া চলে গেছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এখন সময় আমাদের রাজনীতিবিদদের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়ার এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার। কারণ ইতিহাস কেবল স্মরণ করার জন্য নয়; ইতিহাস শেখানোর জন্যও।
লেখক: ব্যাংকার ও বিশ্লেষক












