• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

প্রস্তাবিত মক্কা চুক্তিঃ সুযোগ, সম্ভাবনা এবং হুমকি, প্রসঙ্গে

প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:৫৬
আপডেট: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:৫৬

প্রস্তাবিত মক্কা চুক্তিঃ সুযোগ, সম্ভাবনা এবং হুমকি, প্রসঙ্গে

বাংলাদেশ  

মক্কা চার্টারের প্রথম ধারণা পোষণ করা হয়েছিল ২০১৯ সালের মে মাসে বিশ্বমুসলিম লীগের একটি সম্মেলনে।যেখানে মূল নীতিগুলো ছিলো ধর্মীয় বন্ধন, সামাজিক সম্প্রীতি,মানবিক মর্যাদা ও সমতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতা রক্ষা, উগ্রবাদ প্রতিরোধ, বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মুসলিমদেশগুলোর শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিকীকরণ নীতি গ্রহণকরা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম ভীতি দূর করা ইত্যাদি। সাম্প্রতিকইসরাইল- ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানেআগ্রাসন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যেনতুন সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একতা ওআধুনিকতার বন্ধন তৈরি করা হলে একটি শক্তিশালী সামরিক জোটেরআত্মপ্রকাশ ঘটবে। যার কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এই জোটপ্রভাবকের মতো কাজ করবে। কারণ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কারো আছে, অর্থ, কারো আছে প্রযুক্তি আবার কারো আছে শক্তিশালী যোদ্ধা। সব মিলিয়েমুসলিম বিশ্বের এই একতাবদ্ধ হওয়া হলো সময়ের এক অফুরন্ত সুযোগ ওসম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া । কেননা বিশ্ব রাজনীতির অতীত, বর্তমান ওভবিষ্যতের কৌশলগত দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে কোন না কোনোভাবে কিংবাকোনো না  কোন সময়ে জোটবদ্ধ হওয়ার বিকল্প পথ খোলা নেই ।আর এখানেমূল কৌশলগত সংঘাতের দিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নয়। বরংরাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে মুসলিমদের জোরালো উপস্থিতিগ্রেটার রাষ্ট্র ( ভারত ও ইসরাইল) প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ব্যর্থ করার প্রতিশেধকেরভূমিকা পালন করবে। তাই এখানে মূল বাধা চীন, রাশিয়া কিংবা পশ্চিমাশক্তি নয় । ইসরাইল ও ভারতের মধ্যকার অভিন্ন স্বার্থ মুসলিম বিশ্বেরসামরিক জোট গঠনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা।তাই বাংলাদেশকে এই জোটে যোগদেয়ার পূর্বে বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ, দক্ষিণ এশীয়,দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়াররাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক মনোভাব এবং ভবিষ্যৎ দর্শন সম্পর্কেবিস্তারিত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।

বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণে একক পরাশক্তির দুর্বলতা সম্পর্কে বিশ্ববাসীঅনেক আগেই ধারণা পোষণ করেছেন। অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক ওরাজনৈতিক উত্থান একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক আগেইতুলনামূলক অবস্থানে নিয়ে এসেছে । তাছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের সাথে রাশিয়ারযে ক্রমবর্ধমান বিরোধ তা চীন ও রাশিয়াকে একজোটে উজ্জীবিত করেছে ।অন্যদিকে বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের ওপর অবরোধ মধ্যপ্রাচ্যেররাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসরাইলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে । আবার গ্রেটারইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের উপর ইসরাইলের অবৈধ আগ্রাসনও সংগঠিত যুদ্ধপরাধ ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বৈধতা পাচ্ছে। যারফলে মুসলিমদেশগুলোর মধ্যে ইসরাইলের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভ রয়েছে।অন্যদিকে ভারতও তার গ্রেটার ভারত প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রেটার ইসরাইলের স্বপ্নকে সমর্থন দিয়েআসছে।সম্প্রতি কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগী দেশ হিসেবে স্বীকৃতিপেয়েছে।মোদ্দা কথা হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্বশক্তিগুলো বিভিন্নআঞ্চলিক,রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এইঅবস্থায়, রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেন, ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃকগ্রীনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে দরকষাকষি যা ইউরোপের সাথে সম্পর্কেরঅবনতি, এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানবিশ্বশক্তির বহু মেরুকরণের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। সেই ভূ-রাজনৈতিকবাস্তবতায় এখন আর কেউ প্রাচ‍্যের শান্তিপ্রিয় দেশ জাপান কিংবা পাশ্চাত্যেরবিশ্ব নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ড হিসেবে ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক কৌশলগত কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থ ও ধর্ম উভয়কেনিয়ন্ত্রণ করে। আবার যারা গ্রেটার রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেন তারাও তা ধর্মীয়দর্শন ও সম্প্রসারণবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবায়ন করতে চান। সেই বাস্তবতায়দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ,পাকিস্তান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোরমধ্যে তাদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাবজায় রাখার ব্যাপারে কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এখনবাস্তবসম্মত রূপ লাভ করেছে ।

বাংলাদেশের সংবিধানে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবেঘোষণা করা হয়েছে । সংবিধানের ধারা (২)ক বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রধর্মইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ওসমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন। সুতরাং তা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, বাংলাদেশযদি ধর্মীয় একাত্ববোধের প্রতি সম্প্রীতি, সংহতি এবং সংস্কৃতির আলোকেজোটবদ্ধ হয় তাহলে ও তা বাংলাদেশের জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবংমৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবার আশঙ্কা নেই। কারণ প্রজাতন্ত্রের সকলনাগরিকের অধিকার রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে।তাই মক্কা জোটে যোগ দিতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই তার রাজনৈতিকদর্শন, ধর্মীয় মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং জোটের বিভিন্ন উদ্দেশ্য ওধারা সমূহ সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এগোতে হবে। তাছাড়া সবারআগে বাংলাদেশ নীতি ও রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

মক্কা জোটে যোগ দেয়ার আগে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রাপ্তির বিষয়ে বিশ্লেষণজরুরি । এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে যেসব সুযোগ ও সম্ভাবনা আসবে তাহলো ধর্মীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরালো হবে, নারীর ক্ষমতায়ন আরো গতিবাড়বে, সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলামভীতি দূর করতে সরকার আরো বেশি সক্রিয়থাকবে । কারণ তা জোটের মূলনীতির সাথে অন্তর্ভুক্ত । বাংলাদেশের তারুণ্যশক্তি মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেপারবে । বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রেও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে বাংলাদেশের সামনেএকটি নতুন অধ্যায় সূচনা করবে। তাছাড়া মক্কা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশসম্মিলিত প্রযুক্তি, কূটনীতি ও পররাষ্ট্র নীতি, এবং সামরিকীকরনের ক্ষেত্রেটেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে । ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের প্রথাগত ওঅপ্রথাগত সামরিক হুমকি মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হবে।এমনকি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যেরদেশগুলোর সাথে মেলবন্ধন ছাড়া বিকল্প কোন উৎস নেই ।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করলে সহজেই যেটা অনুমেয় তা হলোআমরা ভারতের পেটের ভেতর বসবাস করি! যদিও সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল জুড়েরয়েছে বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বের শেষাংশে মিয়ানমারের সাথে সীমান্তরয়েছে। আবার ধর্মীয় ভৌগোলিক অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়বাংলাদেশের নিকটবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হলো পাকিস্তান এবংআফগানিস্তান।তাও আবার দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে।অপরদিকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার অধিক দূরে রয়েছেমালয়েশিয়াও ইন্দোনেশিয়া। উত্তরের প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিতভুটান, তা আবার ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে বিভক্ত। বৃহৎ শক্তিচীনের তীব্বতের সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার ।এখানে প্রশ্ন আসতে পারে ধর্মীয় ভৌগোলিক অবস্থান কেন পর্যবেক্ষণে রাখতেহবে? কারণ বর্তমান যুগে ভারতের মনোভাব বিশ্লেষণের জন্য আমাদেরকে ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।এই জন‍্য আনতে হবে যে প্রাচীনভারতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে এই অঞ্চলেযখন সিন্ধু সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই থেকেই এই অঞ্চলে মাতৃপুজা, পশুপতি শিবের পূজা কিংবা প্রকৃতি পূজা ছিল। যদিও তা ধর্মীয় ছিল না।পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে বৈদিক বা আর্য সভ্যতার সূচনা ঘটে, তখনইপ্রথম সনাতন ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল। পরবর্তীতে খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতেমহাজনপদ সময়কালে গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক বৌদ্ধধর্ম এবং মহাবীর কর্তৃকজৈনধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরবর্তীতে চন্দ্রগুপ কর্তৃক প্রাচীন ভারতেশক্তিশালী মৌর্য‍্য সাম্রাজ্য (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২-১৮৫) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যদিওসম্রাট অশোক এ সময় বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এ সময়ের সবচেয়ে বড়দার্শনিক ও কুটনীতিক ছিলেন কৌটিল্য। যিনি চাণক্য বা বিঞ্চুগুপ্ত নামেপরিচিত ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে অরি (Ari) বা শত্রু হিসেবেউল্লেখ করেন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পরের রাষ্ট্রকে মিত্র (Mitra) হিসেবেবিবেচনা করেন। যা তাঁর বিখ্যাত বই কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে “Mandala Theory” নামে পরিচিত। মূলত ভারতের পররাষ্ট্র নীতির বৈশিষ্ট্যে এবংআচরণগত চর্চার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতিতে যাইথাকুক না কেন, তা পরিচালিত হয় চাণক্য নীতির আলোকে।তারপর গুপ্তসাম্রাজ্যের ( ৩২০-৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনদের ধর্মীয়সহাবস্থান ছিল। তৎপরবর্তীকালে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাশিম কর্তৃকসিন্ধু ও মুলতান (বর্তমান পাকিস্তান) জয় করেন এবং বাংলায় ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ১২০৪ সালে লক্ষন সেনকে পরাজিত করে বাংলারপ্রথম মুসলিম শাসনের সূত্রপাত করেন। সুতরাং বলা যায়, ভারতীয়উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পদচিহ্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়কারণে প্রতিষ্ঠা পায় এবং পরবর্তীতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেওতপ্রোতভাবে মিশে যায়। আলোচনা পর্যবেক্ষণে বলা যায়, দক্ষিণ এশীয়রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মীয় তাৎপর্য ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অখণ্ড ভারতের স্বপ্নএই উপমহাদেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক নীতি এবং কূটনৈতিককৌশলে ভারত তা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোরসাথে তাদের সম্পর্ক হতে হবে অধীনস্ত বন্ধু, যেমন ভূটান। আর তা না  হলেতাদের সাথে দেশীয় রাজ‍্যের (হায়দারাবাদ, কাশ্মীর, সিকিম ইত্যাদি) মতোমিশে যেতে হবে। এমতাবস্থায়, ধর্মীয় ষড়যন্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে হলেভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে কৌশল অবলম্বনের বিকল্প পথ নেই।

বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বলতে অভ‍্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে তাদেরনিজস্ব নীতি গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জন করাকেনির্দেশ করা বুঝায়। আর এখানেই বাংলাদেশের মক্কা জোটে যোগ দিতে বড়ঝুঁকি রয়েছে! বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বলা হয়, বাংলাদেশ সব সময়ইপ্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পারস্পরিকসহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়ন করার পক্ষপাতী। কিন্তু ভারতের মনোভাব হলোসুসম্পর্ক তারাও চায়, তবে তা হতে হবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে। যারকারণে সার্কের কার্যক্রম কার্যকর হতে পারে না। ভারতের চাণক্য নীতিঅনুযায়ী কোন প্রতিবেশী দেশকে তারা বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে না। কিন্তুভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি নেই! এখানেই কৌশলগতস্বার্থ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। চাণক্য কৌশল হলো প্রতিবেশী অপেক্ষাকৃত দুর্বলরাষ্ট্র গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ভারত এখানে দুটি কৌশল অবলম্বন করে।দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্ব করে আরো বেশি নিয়ন্ত্রন করার জন্য এবংশক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করে নিজের স্বার্থ ও শক্তি বজায় রাখার জন্য।আবার শত্রু রাষ্ট্রের উপর শত্রুতা বজায় রাখা তাদের নীতির অংশ। তাইবাস্তবেও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সাথেকারো কোনো কার্যকর সুসম্পর্ক লক্ষ্য করা যায় না। আগেই বিশ্লেষণ করাহয়েছে ভারত তার নীতি অনুসরণ করে ধর্মীয়  সম্প্রসারণবাদের  আলোকে যাইসরাইলের সাথে মিলে যায়। সুতরাং বাংলাদেশ মক্কা জোটে যোগদান করলেযে ভারতের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবে সেটাই একমাত্র কারণ নয়। বরং এই জোটেযোগদান না করলেও ভারতের প্রথাগত ও অপ্রথাগত হুমকিতে থাকতে হবে।উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০০১ সালে পাদুয়া সীমান্তে যুদ্ধ, পরে একই সময়েরৌমারী সীমান্ত যুদ্ধ, বাংলাদেশের পিলখানা হত্যাকাণ্ড তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত।তার মোদ্দা কথা হলো ভারত বাংলাদেশকে সীমিত সার্বভৌম, দুর্বল, অকার্যকর এবং অধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করতে চায়। চাণক্য নীতিঅনুযায়ী বাংলাদেশকে তারা শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে মূল্যায়ন করে। তাই তারা শত্রুদুর্বল হলে আক্রমণাত্মক কৌশল, শক্তিশালী হলে বন্ধুত্বের কৌশল গ্রহণকরবে। এজন্য তারা চতুরোপায় পদ্ধতি (Four Method) অবলম্বনে নিয়ন্ত্রণকরে। আর তা হলো, প্রথমত, প্রলোভন, শান্তি কিংবা সমঝোতার পথঅবলম্বন; দ্বিতীয়, অর্থ বা উপহার উপঢৌকন দিয়ে করায়ত্ব করা; তৃতীয়ত, শত্রুর ভিতরে বিভেদ, অনেক‍্য তৈরি করে দুর্বল করা; (যা বাংলাদেশের সাথেমিলে যায়) চতুর্থত, প্রয়োজন ও সময় বুঝে শক্তি প্রয়োগ বা যুদ্ধের পথঅবলম্বন করা; (বাংলাদেশের ভিতরে ভারতের কিছু সার্জিক্যাল স্ট্রাইক তারপ্রমাণ)।অতএব, বাংলাদেশকেও স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেঅগ্রসর হতে হলে বিশ্বের ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, আঞ্চলিক ও বিশ্বপরাশক্তিরগুলোর সাথে কৌশলগত,কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকসম্পর্ক জোরদার করার বিকল্প নেই। আর এই পথ পাড়ি দিতে হলেবাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ দক্ষিণএশিয়ায় পশ্চিমা শক্তির বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে যা ভারতকে দিয়েতারা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। ভারত আবার রাশিয়ার ও চীনের সাথেওজি-৭ বিরোধী ব্রিকসের প্রভাবশালী সদস্য। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকেবাদ দিলে বাকী প্রায় সব দেশের সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ও স্বার্থ জড়িত।সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে ধর্মীয়, ভূকৌশলগত, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিকযেকোনো বিষয়ে সম্পর্কের সেতুবন্ধন হলে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি থাকার সম্ভাবনাক্ষীণ। তাছাড়া বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও অনেকগভীর ও শক্তিশালী । রাশিয়া ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর সাথেও তাই।সুতরাং পর্যবেক্ষণের আলোকে বলা যায় যেসব দেশ ধর্মীয় সম্প্রসারণের জন্যপ্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে শত্রুতামূলক আচরণ এবং সম্পর্কের প্রতিনিধিত্বকরে তারা বাংলাদেশের মক্কা জোটে অংশগ্রহণকে হুমকি হিসেবে ব্যবহারকরবে।

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে বলা যায়, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানদুর্বল বা সুরক্ষিত ( Vulnerable)নয়, অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময়(Potential), রাজনৈতিকভাবে সাংঘর্ষিক ও অবিশ্বাস্যের উপাদান রাজনৈতিকদলগুলোর মধ্যে উচ্চতর মাত্রায় বিদ্যমান, সামরিক দিক থেকে বৃহৎ প্রতিবেশীদেশের তুলনায় দুর্বল, জাতীয় শক্তি জোরালো কিন্তু অস্থিতিশীল, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে বিভক্ত। এই পরিস্থিতিতে সবার আগে বাংলাদেশনীতির কোনো বিকল্প হতে পারে না। কেননা ভারত ও ইসরাইলের ধর্মীয়সম্প্রসারণবাদী নীতি মধ্যপ্রাচ্যে ও দক্ষিণ এশীয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকেজোরালোভাবে একত্রিত করবে। মক্কা জোট বাংলাদেশের স্বাধীনতা ওসার্বভৌমত্বের অন্যতম সহায়ক শক্তির দেয়াল হিসেবে বিবেচিত হবে। যদিওএকটি দেয়ালই যথেষ্ট নয়।

মোঃ শাহজাহান মিয়া

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতীয় বিতার্কিক

ই-মেইলঃ shahjahanau.bd@gmail.com


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com