শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও পালটাপালটি বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে দুই দলের দূরত্ব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যেই জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতা’র গুঞ্জন এবং বিএনপি-জামায়াতের পালটাপালটি অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কেন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এই দূরত্ব, এর নেপথ্যে কী রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সামনে এর প্রভাবই বা কতটা পড়তে পারে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতার’ গুঞ্জনে দল দুটির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে জামায়াত নেতারা ভিন্নকথা বলছেন। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ঢাকতে গিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে সখ্য রাখার অপপ্রচার চালাচ্ছে বিএনপি।
সূত্রমতে, নির্বাচনের মাত্র সাত মাস যেতে-না-যেতেই জামায়াত ও এনসিপির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও বিএনপি ক্ষুব্ধ। তাছাড়া সরকারের মেয়াদের এত অল্প সময়ের মধ্যে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা আছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন-এত কম সময়ের মধ্যে লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তারা আর কী ধরনের কর্মসূচি পালন করবে? তাছাড়া অব্যাহত কর্মসূচির কারণে নতুন করে দেশ অচল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো দ্বন্দ্বে জড়ালে দেশের সবার ক্ষতি। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে অতীতে যে অন্যায়, অবিচার, অপকর্ম হয়েছে; সেগুলো অব্যাহত থাকলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি ব্যর্থ হলে জামায়াত বা আওয়ামী লীগ আসতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগের আসার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। তাই আমি বলব, সরকার ও বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে সংলাপে বসে বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করুক। তা না হলে পরিণতি হলো অরাজকতা এবং এর মাশুল দেবে বাংলাদেশের জনগণ। আমাদের রাজনীতিকদের দূরদর্শিতা, তাদের অপরিপক্বতা ও সীমাবদ্ধতার জন্যই আমরা অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দেশে অরাজকতাই চাচ্ছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী প্রত্যাশা ছিল, সরকার ও বিরোধী দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে সে ধরনের বেশকিছু ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব এখন সুস্পষ্ট। যদিও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার কথা বলছে বিএনপি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে নতুন করে কোনো পারস্পরিক বৈঠকের বা আলাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে বিএনপির একটি বড় অংশের মতে, সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাই বর্তমান সরকারের জন্য টেকসই সুফল বয়ে আনবে।
ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সমাজে সংসদেই বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার কথা। সরকারের বয়স মাত্র ৬-৭ মাস হওয়ার পরেই রাজপথে নামার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সব ধরনের বিরোধ ও মতপার্থক্য জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেটি না করে জামায়াত অন্য পথে যাচ্ছে।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব কিংবা সমঝোতার প্রশ্ন তো তখন আসে, যখন তার আসল চরিত্রটা বোঝা যায়। জামায়াতের আসল চরিত্র বোঝা মুশকিল। অতীতে তারা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের বন্ধু হয়েও আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিকে না জানিয়ে হঠাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে যায়।
তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে হটাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে রাজপথে আন্দোলন করে। ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘদিন বিএনপির পাশে থেকে ২০০১ সালে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়। অথচ এক-এগারোর পর আবার বিএনপির দায় নিতে অস্বীকার করে।
আলাল বলেন, ঘন ঘন দিক পরিবর্তনকারী দলকে বোঝা কঠিন বিধায় তাদের সঙ্গে সমঝোতা বা দ্বন্দ্ব-উভয় ক্ষেত্রেই গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। জামায়াত যদি সঠিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন না করে এবং এভাবে দিক বদলাতে থাকে, তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যুগান্তরকে বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময় বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অনেক জায়গায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে।
এদিকে জামায়াতের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে দলটির মতদ্বৈধতা রয়েছে। এছাড়া সরকারকে চাপে ফেলে তারা আরও কিছু দাবি আদায় করতে চায়। পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার চিত্র জনমনে তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পথও তৈরি করার কৌশল নিয়েছে দলটি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি তাদের ভারতপ্রীতি, দিল্লিপ্রীতি ঢাকতে গিয়ে অসত্য কথা বলছে। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার আওয়ামী লীগ সারা দেশে একদিনে মিছিল করার সুযোগ পায় কী করে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকায় নিষিদ্ধ দল মিছিল করার দুঃসাহস কীভাবে পায়? মানুষ কি বোঝে না? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কি খবর নেই?
এনসিপি যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগকে বিএনপিই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। আমরা বলেছি, সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, চাঁদাবাজি, দখলদারি বন্ধ করতে হবে। তাহলে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব। কিন্তু সরকার সেটা না করে বিরোধী দলের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিচ্ছে।
আ/আ












