• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

মিডিয়া

নায়িকা শাবানা কেন অভিনয় ছেড়েছিলেন

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২:১৩
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২:১৩

নায়িকা শাবানা কেন অভিনয় ছেড়েছিলেন
 

মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক। এরপর তিন যুগ ধরে অভিনয়, একের পর এক উপহার দিয়েছেন দর্শকনন্দিত সব সিনেমা আর পেয়েছেন হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা। এর মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের অনন্য এক জায়গা তৈরি করেছিলেন। পুরো নাম আফরোজা সুলতানা রত্না হলেও তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে শাবানা নামেই পরিচিত। অভিনয়জীবনের ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ ক্যামেরার সামনে থেকে সরে দাঁড়ান তিনি, পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ফেলে যান দীর্ঘদিনের কর্মজীবন, সহশিল্পী ও অগণিত ভক্তকে। কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই অভিনয়শিল্পী? শাবানার মতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং মা হিসেবে তাঁদের পাশে থাকার তাগিদ থেকেই অভিনয় ছেড়েছিলেন তিনি।

বাবা–মায়ের আফরোজা সুলতানা রত্না, ষাটের দশকের শুরুতে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। ১৯৬৭ সালে একই পরিচালকের উর্দু ছবি ‘চকোরী’তে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরে একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় এই নায়িকা। এরপর নায়িকা থেকে ভাবি, মা—বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং দেশের চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা।

শাবানার বাবার নাম ফয়েজ চৌধুরী, যিনি চট্টগ্রাম আদালতপাড়ায় টাইপিস্ট ছিলেন, একটা সময় চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় পরিচালনাও করেন। আর মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই প্রথম সিনেমায় অভিনয়ে নাম লেখান শাবানা। ‘নতুন সুর’ ছবিতে শাবানা যখন অভিনয় করেন, তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে শাবানার বাবাকে তখন এহতেশামই বলেছিলেন, ‘তোর মেয়েটাকে আমি একটি ছবিতে নিতে চাই।’ শাবানার বাবা তখন নাকি এভাবেই বলেছিলেন, ‘রত্না (শাবানার ডাক নাম) কীভাবে অভিনয় করবে! সে এত লাজুক, কারও সামনেই আসতে চায় না।’ নাছোড়বান্দা এহতেশাম বলেছিলেন, ‘তোর মেয়েটার মতো একটা মেয়েই আমি খুঁজছি। এরপর শাবানার বাবা রাজি হন।’ ওই ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন রহমান-রওশান আরা।

সেই সময়ের কথা মনে করে শাবানা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘ছবিতে আমার প্রথম দৃশ্য ছিল এমন, খুশিতে আমি দৌড়ে এসে বলব, “ভাইয়া, ভাইয়া, আপুর বিয়ে।” আমাকে জড়িয়ে ভাইয়া বলবে, “তাই নাকি রে!” প্রথমবারে শট ওকে! তার পর থেকে মায়ের চেয়ে বাবাই সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। আমার বাবাও কিন্তু কয়েকটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন। “মুক্তি” (১৯৬৯), “মালকাবানু” (১৯৭৪), “বিজয়িনী সোনাভান” (১৯৭৯), “আলতাবানু” (১৯৮২) ও “রাজার মেয়ে বেদিনী” (১৯৯১)। এর মধ্যে তো “মালকাবানু” সুপারহিট। গানগুলো এখনো মানুষ গায়।’

বাবা যে রত্নাকে তাঁর জীবনের শুরুতে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে দিতে চাননি, পরে সেই বাবাই হয়ে ওঠেন তাঁর অনুপ্রেরণা। একটা সময় বাবা ফয়েজ চৌধুরী পরিচালিত সিনেমায়ও অভিনয় করেছিলেন শাবানা। এভাবে ধীরে ধীরে শাবানা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের একটা বড় অধ্যায়। এ অধ্যায়ে তিনি শেষ করেন ২৯৯টি সিনেমার কাজ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন আলমগীরের বিপরীতে। এই নায়কের বিপরীতে তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৩০। এরপরই যাঁর সঙ্গে জুটি হয়ে বেশি অভিনয় করেছেন, তিনি নায়করাজ রাজ্জাক।

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি শাবানার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের পেশা ও চেনা জগৎ ছেড়ে যাওয়ার পেছনে ছিল সন্তানদের নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঠিকঠাকভাবে করে দিতে চলে যান তিনি। বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে চলে যান। সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থেকে তাঁদের বেড়ে ওঠার সময়টুকু হারাতে চাননি শাবানা।

প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে শাবানা বলেন, ‘লাখো-কোটি মানুষের ভালোবাসায় শাবানা হলাম। হঠাৎ মনে হলো, সন্তানদেরও তো সময় দেওয়া দরকার। আমার বড় মেয়ে সুমী তখন এ লেভেল শেষ করল। উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হলো। কিছুদিন পর ছোট মেয়ে ঊর্মি আর ছেলে নাহিনও যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল। ওদের সবার বয়সই–বা তখন আর কত। বাচ্চারা আমাকে খুব মিস করছিল। দেশে যখন ছিল, তখন তো আমার চোখের সামনেই ছিল। কাজের ফাঁকে দেখতাম। তখন আমিও ভাবলাম, মা হিসেবে আমার তো কিছু দায়িত্ব আর কর্তব্য আছে। সন্তানদের যদি ঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমার এই অভিনয়জীবন দিয়ে কী হবে! তাই কষ্ট হলেও সিনেমা ছেড়ে সন্তানদের ব্যাপারে মনোযোগী হলাম। এ জন্যই বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।’

সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে শাবানাকে তাঁর প্রযোজক স্বামী ওয়াহিদ সাদিক বেশ সহযোগিতা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ব্যবসার সুযোগ ছিল। তাই পরিবারের সঙ্গে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন শাবানা।

দেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি এই অভিনয়শিল্পীর মতে, ‘সাদিক সাহেবও ওখানে কিছু ব্যবসার ব্যবস্থা করলেন। আমিও দেখলাম, অনেক দিন তো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলাম, এবার ঘরের দিকে মনোযোগী হই। তাই চলে গেলাম। তবে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিও কিন্তু আমার কাছে একটা পরিবারের মতো ছিল। সেখানে আমি রাতদিন অবসরবিহীন কাজ করেছি। সহশিল্পী, পরিচালকদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠল। কাউকে ভাই, আবার কাউকে চাচা ডাকতাম। সবাইকে খুব মিস করলেও কিন্তু মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন কোনো উপায় থাকে না। জীবনের ধাপে ধাপে কিছু সময় আসে, সে সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব দরকার। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া, আমি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি।’

সন্তানদের জন্য নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পর কেটে গেছে বহু বছর। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল এমবিএ শেষ করে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। ছেলে নাহিন সাদিক রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি করছেন। তিনিও বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। সন্তানদের পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা শাবানার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি।

শৈশব থেকেই অভিনয়ে যুক্ত থাকায় নিজের জন্য সময় বের করার সুযোগ খুব কমই পেয়েছিলেন শাবানা। কাজের প্রতি একাগ্রতা ছিল এতটাই যে অভিনয়ের সময় অন্য সবকিছু ভুলে থাকতেন। তবে একটা পর্যায়ে পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ প্রসঙ্গে শাবানা বলেন, ‘শৈশবে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হই। নিজেকে দেওয়ার মতো সময় পাইনি। কাজ, কাজ আর কাজ। এভাবেই কেটেছে একটানা ৩৫ বছর। পরিবার ও সন্তানদের সময় দেওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে জরুরি হয়ে পড়ে। তাই সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অভিনয়টা ছাড়তে হয়েছে।’

অভিনয় ছেড়ে দিলেও দেশের চলচ্চিত্রের খোঁজখবর একেবারে অজানা থাকে না শাবানার। যুক্তরাষ্ট্রে বসে ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে যতটুকু পারেন, খোঁজ রাখেন। ঢাকায় থাকাকালে শাকিব খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। স্বামী ওয়াহিদ সাদিক একটি ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা করায় শাকিবের সঙ্গে তাঁদের বাসায় কথা হয়। শাবানার স্মৃতিতে, শাকিব ছিলেন সুদর্শন, ভদ্র ও অমায়িক।

জানা গেছে, কয়েক বছর আগে শাকিব যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে একবার শাবানার নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে শাবানার সঙ্গে ফোনেও কথা হয় শাকিব খানের। দেশের সিনেমা নিয়ে জানতে চাইলে শাকিব খানের নামই বেশি শোনেন বলে জানান শাবানা। তিনি বলেন, ‘শাকিব তো অনেকটা সময় ধরে কাজ করছে। শুনছি, এখন বেশ ভালো করছে। তার সিনেমা মুক্তি পেলে আমাদের এখানেও চলে। বিশ্বের আরও দেশে শাকিবের সিনেমা মুক্তি পায়; এটা নিঃসন্দেহে আনন্দের, গর্বের।’

বিভিন্ন সময়ে নতুন চলচ্চিত্রে শাবানার ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বেগম রোকেয়ার জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যেতে পারে বলে শোনা গিয়েছিল। তবে এখন আর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই তাঁর। বয়স বেড়েছে, জীবনের ব্যস্ততাও বদলেছে। এখন পরিবার, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়েই তাঁর সময় কাটে। শাবানা বলেন, ‘এই বয়সে আর কীভাবে? এখন তো অনেক বয়স হয়ে গেছে। আল্লাহর নাম নিয়ে পার করে দিচ্ছি সময়। মাঝেমধ্যে কাজের সময়ের স্মৃতি মনে করি। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিরা মাঝেমধ্যে আমার ছবি সম্পর্কে নানা কিছু জিজ্ঞাসা করে। আমিও তখন বলি, ওই ছবিটা দেখো। এখন পরিবারটাই আমার জগৎ। এ জগতে আমার অনেক ব্যস্ততা।’

একসময় শুটিংয়ের ব্যস্ততায় দিনরাত কাটানো শাবানার জীবনে এখন সেই কর্মব্যস্ততা নেই। তবু দর্শকের মন থেকে হারিয়ে যাননি তিনি। টেলিভিশনে তাঁর অভিনীত সিনেমা প্রচারিত হয়, পুরোনো চরিত্রগুলো নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে তোলে। অভিনয়ের ব্যস্ত সময়ে সন্তানদের পাশে থাকার জন্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা নিয়ে তাঁর মধ্যে আক্ষেপ নেই; বরং জীবনের প্রয়োজন বুঝে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বলেই সন্তুষ্ট এই বরেণ্য অভিনয়শিল্পী।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম