এম আর কামাল, নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
ছবি : প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গত পাঁচ মাসে বিএনপি ও যুবদলের দুজন শীর্ষ নেতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়টি বিএনপি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এসেছে।
জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তিন মাসের মাথায় আড়াইহাজার উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ও ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এর পাঁচ মাস পর কুপিয়ে হত্যা করা হয় উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফকির জহিরুল ইসলামকে।
স্থানীয় বিএনপি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছে, আড়াইহাজার উপজেলায় প্রকৃত বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন মাঠে নেই। আড়াইহাজারের পলাতক গডফাদার সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর বাহিনীর ক্যাডার ও লোকজন বিএনপির কতিপয় অসাধু নেতার ছত্রছায়ার দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। চাঁদাবাজি, দখল, মাদক ব্যবসা করছে। তাদের ভয়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, পাড়া-মহল্লায় কেউ মুখ খুলতে নারাজ। পুলিশ এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক কোন্দলসহ বিভিন্ন স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, গত ২০ মে রাতে দুপ্তারা ইউনিয়নের পাঁচগাও কাউন্দা চক কবরস্থান এলাকায় ওসমান গণিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডের চার দিন পর নিহত নেতার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া আড়াইহাজার থানায় মামলা করেন। এতে সাবেক এমপি ও হুইপ পলাতক নজরুল ইসলাম বাবুকে হুকুমের আসামি করে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ১২ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। বাদী এজাহারনামীয় ১২ আসামির মধ্যে আওয়ামী লীগের দুজন ছাড়া বাকি সবাই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ওসমান গণি মাটি কাটার ভেকু ভাড়া দিয়ে কাউন্দার চক কবরস্থান এলাকায় তাঁর কেনা মাটি কেটে আসছিলেন। বিবাদীরা কয়েক দফা তাঁর স্বামী ওসমান গণির কাছে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় কয়েক দফা ভয়ভীতি ও হত্যার হুমকি দেয় তারা। এর জের ধরে তাঁকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় দুপ্তারা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রমজান আলী, সুমন মিয়া, সোলেমান হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করলেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনও পুলিশ উদঘাটন করতে পারেনি। আড়াইহাজার থানার ওসি সবজেল হোসেন বলেন, মামলাটি ডিবি তদন্ত করছে। খুব দ্রুত এর হত্যারহস্য প্রকাশ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
হত্যারহস্য উদঘাটন ও সব আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করছেন নিহতের স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া। তিনি দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অপরদিকে গত বুধবার রাতে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফকির জহিরুল ইসলাম কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই দিন রাতে সোনারগাঁ উপজেলার চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় নিজের ফার্মেসি বন্ধ করে বাসায় ফেরার পথে তিনি হামলার শিকার হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত জহিরের ভাগনে ইসমাইল হোসেন ও বিল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, আসন্ন কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা নিয়ে ফকির জহিরের সঙ্গে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্যসচিব মোবারক হোসাইনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর আগে মোবারক ও তাঁর লোকজন নিয়ে কয়েকবার জহিরের ওপর হামলা করেছিলেন।
তবে মোবারক হোসেন বলেন, ঘটনার সময় আমার এলাকায় একটি নাটকের রিহার্সেলে উপস্থিত ছিলাম। নিহতের পরিবারের লোকজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নাম বলছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
যুবদল নেতা ফকির জহিরুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার তিন দিন পর মামলা করা হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় তার ভাগনে ইসমাঈল হোসেন থানায় মামলাটি করেন।
মামলায় আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রিজভীসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। মামলায় সব আসামি আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপি, অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও খালিয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা।
এর আগে গত বুধবার রাতে সোনারগাঁয়ের শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফকির জহিরুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত যুবদল নেতা আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের খালিয়ার চর গ্রামের মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বেপারীর ছেলে। শনিবার সন্ধ্যায় মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনারগাঁ থানার ওসি মুহাম্মদ আব্দুল বারিক।
মামলার বাদী ইসমাঈল হোসেন জানান, কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফকির জহিরুল ইসলাম আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রার্থী হওয়া থেকে সরে যাওয়ার জন্য মামলার আসামিরা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে হুমকি দিয়েছেন। গত বুধবার রাতে যুবদল নেতা ফকির জহিরুল ইসলাম ওষুধের দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন। পথে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রিজভীর নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল তাঁকে কুপিয়ে ফেলে যায়। পরে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় তাঁকে মুন্সীগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সোনারগাঁ থানায় মামলা করা হয়েছে।
সোনারগাঁ থানার ওসি মহম্মদ আব্দুল বারিক বলেন, যুবদল নেতা হত্যাকাণ্ডে ২১ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।আড়াইহাজার উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব খোরশেদ আলম বলেন, জহির যুবদলের একজন ত্যাগী নেতা ছিলেন। তিনি প্রায়ই আমাকে বলতেন, তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে। তবে কার সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল, তা জানি না।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহমেদ বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে নেতাকর্মীরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারেন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।













