ইরান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো ১৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। অথচ যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের চাপে পড়েছে দেশটির সাধারণ ভোক্তারা।
এ পরিস্থিতিতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, আজ মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক হিসাবে বলা হয়েছে, গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানির আয় বিশ্লেষণ করে মুনাফার এ হিসাব পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারেরও কম মুনাফা করেছিল।
নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানে যুদ্ধ ছিল না। বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামও ছিল কম। এবার একই সময়ে ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে হু হু করে।
তবে জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলোর এ বিপুল মুনাফার বিপরীতে বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ পেট্রল ও ডিজেল কিনতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। পরিবারপ্রতি বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ ১ হাজার ১৫০ ডলারেরও বেশি।
এমন ব্যবধান সামনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধের লাভ আদতে কার পকেটে যাচ্ছে? যুদ্ধের মূল্যই–বা চোকাতে হচ্ছে কাদের? ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জিম ম্যাকগভার্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা মোটেও বিশাল মুনাফা করছি না। বরং এ যুদ্ধের জন্য আমাদেরই বিশাল মূল্য চোকাতে হচ্ছে।’
গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানির আয় বিশ্লেষণ করে মুনাফার এ হিসাব করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারেরও কম মুনাফা করেছিল।
লাভের ভাগ জ্বালানি কোম্পানির
ইরান যুদ্ধের কারণে বিভিন্নভাবে লাভবান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলো—এমনটা মনে করছেন ইতালির মিলানভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের (আইএসপিআই) ফেলো নাসের আল-তামিমি।
নাসের আল–তামিমি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোও অস্বাভাবিক মুনাফা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুটি জ্বালানি তেল কোম্পানি এক্সনমবিল ও শেভরন। গত শুক্রবার কোম্পানি দুটি তাদের মুনাফার হিসাব প্রকাশ করেছে। তাদের মুনাফা ১ হাজার কোটি থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে।
মুনাফা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও এখনো তা ২০২২ সালের চেয়ে কম। ওই বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে উঠেছিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার।
মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। মজুতও কমেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী কোম্পানি ভ্যালেরো এনার্জির তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই–সেপ্টেম্বর) মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ছয় গুণের বেশি বেড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
আরেকটি কোম্পানি ফিলিপস ৬৬ জানায়, একই প্রান্তিকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা হয়েছে। কোম্পানির নিট আয় আগের বছরের একই সময়ের ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৫৬২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সরবরাহ কমায় বাড়ছে দাম
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গালফ স্টেটস ইনসাইটস নিউজ লেটারের সম্পাদক জিওফ্রে মিলার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত—দুই ধরনের জ্বালানি সরবরাহে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে।
মিলার আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দামে ঝুঁকিজনিত বাড়তি মূল্য যোগ হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো কাঠামোগতভাবে এ বাড়তি দামের সুবিধা নেওয়ার মতো অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বাড়তি ব্যয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সেটা থেকে তাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ অনেকটা সীমিত হয়ে গেছে।
জ্বালানি পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত নিরপেক্ষ সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) জানিয়েছে, জিসিসির ছয়টি সদস্যদেশে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে অন্তত ১৭২টি হামলা চালিয়েছে ইরান ও ইরান–সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। তবে এসব হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোও আক্রান্ত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেশির ভাগ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর জবাবে ইরানের তেল ও গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।













