শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীতরেশন
কার্ড, ভিজিএফ, ভিজিডি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি—দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে চালু হয়েছে নানা ধরনের কার্ড। সর্বশেষ এই তালিকায় যোগ হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড।
আবার পরিচয় প্রমাণের জন্য একজন নাগরিকের আছে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন। সরকারি সুবিধা থেকে ব্যক্তিগত পরিচয়, বিভিন্ন প্রয়োজনে নাগরিককে ব্যবহার করতে হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কার্ড ও পরিচয়পত্র।
আরও পড়ুন
সব নাগরিকের জন্য আসছে ‘এক-আইডি’, পাওয়া যাবে স্বাস্থ্য–শিক্ষাসহ সব সেবা
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সব নাগরিকের জন্য আসছে ‘এক-আইডি’, পাওয়া যাবে স্বাস্থ্য–শিক্ষাসহ সব সেবা
এখন এই বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাকে একটি পরিচয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা এক-আইডি ব্যবস্থায় জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিককে একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবায় সারা জীবন একই পরিচয় ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে।
কিন্তু বাংলাদেশে এক পরিচয়ের এই ভাবনা একেবারে নতুন নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে কার্ডনির্ভর সরকারি সহায়তার দীর্ঘ ইতিহাস। রেশন কার্ড থেকে শুরু করে ভিজিএফ, ভিজিডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড—কীভাবে তৈরি হলো এই দীর্ঘ পথ? আর এত কার্ডের পর কেন আবার এক পরিচয়পত্রের (আইডি) প্রয়োজন দেখা দিল?
এই অঞ্চলে কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য বিতরণের ইতিহাস শুরু ব্রিটিশ আমলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে শহরাঞ্চলে বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার।
এই অঞ্চলে কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য বিতরণের ইতিহাস শুরু ব্রিটিশ আমলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে শহরাঞ্চলে বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানেও এই ব্যবস্থা বহাল থাকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও রেশনব্যবস্থা চালু ছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানেও এই ব্যবস্থা বহাল থাকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও রেশনব্যবস্থা চালু ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশে রেশনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্ট্যাচুটরি রেশনিং বা বিধিবদ্ধ রেশনিং (এসআর)। রেশন কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ কম দামে চাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য কিনতে পারতেন।
বর্তমান বিএনপি সরকারও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কার্ড চালু বা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয় ছিল দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া। সরকার গঠনের পরপরই এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হয়।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় সরকারি ভর্তুকির খাদ্য শহরের তুলনামূলক প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর কাছে বেশি পৌঁছাচ্ছিল, এমন অভিযোগও ছিল। প্রশাসনিক দুর্নীতি, মজুতদারি ও খাদ্যশস্য পাচারের বিষয়ও আলোচনায় আসে।
একপর্যায়ে রেশনব্যবস্থা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর বদলে সরকার কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা অর্থ দেওয়ার বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেয়। এর মধ্যে আছে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও টেস্ট রিলিফ (টিআর)।
তবে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীতে এখনো রেশনব্যবস্থা চালু আছে।
রেশনব্যবস্থা সংকুচিত হলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্ডের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও নির্দিষ্ট সুবিধার জন্য আলাদা আলাদা কার্ড চালু হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে চালু হয়েছে ভিজিএফ কার্ড, ভিজিডি বা দুস্থ নারীদের কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসংক্রান্ত কার্ড। উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাঁদের কাছে খাদ্য, অর্থ বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। তবে একেক কর্মসূচির জন্য তৈরি হয়েছে একেক ধরনের তালিকা ও ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ এখন নাগরিকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরির পরিকল্পনা করছে। এ জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল।
এই ব্যবস্থার পাশাপাশি কম দামে খাদ্যপণ্য বিক্রির জন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রমও চলেছে। ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে তেল, ডাল, আলু ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এর পরিধি, পণ্য সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এই কর্মসূচির চাহিদা আছে।
নতুন সরকারের নতুন কার্ড
বর্তমান বিএনপি সরকারও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কার্ড চালু বা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয় ছিল দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া। সরকার গঠনের পরপরই এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হয়।
এক-আইডি চালু হলে ধীরে ধীরে এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো বিদ্যমান কার্ডের আলাদা কার্যকারিতা থাকবে না—এমন পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
গত ১০ মার্চ ১৪টি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এর বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। পাইলট কর্মসূচির জন্য মন্ত্রণালয় নীতিমালাও করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনা। কার্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলো মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ বছরে প্রায় চার কোটি পরিবারকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষকের জন্য আরেক কার্ড
বর্তমান সরকারের আরেকটি বড় উদ্যোগ কৃষক কার্ড বা স্মার্ট কৃষক কার্ড। এটি কৃষকদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র এবং কৃষিসেবা পাওয়ার একটি সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিন প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ১০ জেলার ১১টি ব্লকে কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এটি বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় থাকলেও এর আওতা শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা নেই। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে এর আওতায় আনার কথা বলা হচ্ছে।
ফসল উৎপাদক, বর্গাচাষি, ইজারা চাষি, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরা এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, কৃষিঋণ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, সরকারি প্রণোদনা, কৃষিবিমা, প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনায় আরও কার্ড
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আরেকটি কার্ড হলো প্রবাসী কার্ড। তবে ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো এটি এখনো চালু হয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, শিগগির প্রবাসীদের জন্য এই কার্ড চালু করা হবে। তবে এটি এখনো প্রস্তুতি পর্যায়ে আছে।
গত জুলাইয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ন্যাশনাল হেলথ কার্ড চালুর কথাও জানিয়েছেন। এটিও এখনো চালু হয়নি।
অর্থাৎ একদিকে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কার্ড তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সব নাগরিকের পরিচয় ও সেবা একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনার পরিকল্পনাও এগোচ্ছে।
এই দুই উদ্যোগের মাঝখানেই এসেছে নতুন প্রশ্ন, আলাদা আলাদা কার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর বদলে কি একটি পরিচয় দিয়েই সব ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব?
অন্য দেশগুলো কী করেছে
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্বের কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো যেতে পারে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ একাধিক কার্ড নয়, বরং ভিন্ন পথে এগিয়েছে। সিঙ্গাপুরে ‘সিংপাস’ নামে জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা চালু আছে। এটি ব্যবহার করে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে আড়াই হাজারের বেশি সেবা নেওয়া যায়।
স্বাস্থ্যসেবা, কর, আবাসন ও সঞ্চয়সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন সেবায় সিংপাস দিয়ে লগইন করা যায়। এই ব্যবস্থায় আঙুলের ছাপ, মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ বা দুই স্তরের যাচাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। সিংপাসের ডিজিটাল আইডি সরাসরি পরিচয়পত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
পাশের দেশ ভারতে রয়েছে আধার কার্ড। এটি ১২ অঙ্কের একটি অনন্য পরিচয় নম্বর, যা ব্যক্তির বায়োমেট্রিক ও জনমিতির তথ্যের সঙ্গে যুক্ত। পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি, পেনশন, বৃত্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পেতে আধার কার্ড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। রেশন, ব্যাংক হিসাব খোলা ও সরকারি সুবিধার অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার আছে। মুঠোফোনের সিম ও পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় পরিচয় যাচাই এবং রেল ও বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রেও আধার কার্ড ব্যবহার করা হয়।
ফ্যামিলি কার্ড
ফ্যামিলি কার্ড
তবে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। সেখানে রাজ্যভিত্তিক ড্রাইভিং লাইসেন্স বা স্টেট আইডি, পাসপোর্ট ও সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর (এসএসএন) পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। নবজাতকের জন্মের পর থেকেই এসএসএন নেওয়ার সুযোগ আছে। কর, ব্যাংক হিসাব, চিকিৎসা ও বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
মূলত কর্মীদের আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার হিসাব রাখার জন্য ১৯৩৬ সালে এসএসএন চালু করা হয়েছিল। পরে এটি কর, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
এদিকে যুক্তরাজ্য একক ডিজিটাল লগইন ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। দেশটির সরকার ‘গভ.ইউকে ওয়ান লগইন’ নামে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মাধ্যমে কর পরিশোধ, পাসপোর্ট তৈরি, ভোটার নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় প্রবেশ করা যায়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২০০টির বেশি সরকারি সেবা এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এবার এক-আইডির পথে বাংলাদেশ
বিশ্বের এসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশও এখন নাগরিকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরির পরিকল্পনা করছে।
এ জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল। অনুমোদনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে জন্মের পর জন্মনিবন্ধন সনদ এবং ১৮ বছর বয়সে এনআইডি দেওয়া হয়। নতুন ব্যবস্থায় শিশুকাল থেকেই একজন নাগরিককে একটি স্থায়ী পরিচয়ের আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে। সারা জীবনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে একই পরিচয় ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে।
সরকার বলছে, দেশে বিভিন্ন ধরনের কার্ড ও পরিচয়পত্র থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। নতুন পরিচয় হবে একক ও স্থায়ী। এক-আইডি চালু হলে ধীরে ধীরে এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো বিদ্যমান কার্ডের আলাদা কার্যকারিতা থাকবে না—এমন পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
সরকারের ভাষ্য, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’। অর্থাৎ একজন নাগরিকের একটি ডিজিটাল পরিচয় থাকবে এবং এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনও করা যাবে। তবে কার্ডে কী কী তথ্য থাকবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
প্রকল্পে ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হলেও কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের সংখ্যা ধরা হয়েছে ২০ কোটি। প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
নতুন কার্ড, নাকি সমন্বিত পরিচয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএনের তথ্যভান্ডারের মধ্যে আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে একই তথ্য বারবার নেওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কৃষক কার্ড
কৃষক কার্ডপ্রতীকী ছবি: প্রথম আলো গ্রাফিকস
১৮ বছরের কম বয়সীদেরও একটি সমন্বিত পরিচয়ের আওতায় এনে বর্তমান ব্যবস্থাকেই একক পরিচয়ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া যায় কি না, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে সেই প্রশ্নও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের কার্ডের ইতিহাস তাই শুধু নতুন নতুন সুবিধা চালুর ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নাগরিককে শনাক্ত করা এবং তাঁর কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতির বিবর্তনের ইতিহাসও।
রেশন কার্ড থেকে ভিজিএফ, ভিজিডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড হয়ে এখন এক-আইডি—এই দীর্ঘ যাত্রায় মূল চ্যালেঞ্জ হলো একজন নাগরিককে একবার শনাক্ত করে তাঁর তথ্য নিরাপদ রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সেবা তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া। নতুন ব্যবস্থা সেই সমন্বয় কতটা করতে পারে, শেষ পর্যন্ত তার ওপরই নির্ভর করবে এক-আইডির সাফল্য।
আ/আ












