শরীয়তপুর প্রতিনিধি ॥ উজান থেকে নেমে আসছে ঢলের পানি। সেই সঙ্গে হচ্ছে ভারি থেকে মাঝারি বৃষ্টি ও। এ অবস্থায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদী আগ্রাসী রূপ নিচ্ছে। পদ্মা সেতুর প্রায় দুই কিলোমিটার ভাটিতে জাজিরার ছয়টি ইউনিয়নের দুর্গম এলাকা নদী ভাঙ্গনের হুমকিতে রয়েছে। নদীভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তীরবর্তী গ্রাম ও ফসলি জমি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ভাঙ্গন আতংকে নির্ঘুম রাত কাটছে পূর্বনাওডোবা, পালেরচর, বড়কান্দি, জাজিরা, বিলাশপুর ও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের।
সূত্র জানা যায়, নাওডোবা এলাকার ওপর দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর আশপাশে সেনানিবাস সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। ওইসব স্থাপনা ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা করতে নদী শাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকা থেকে ভাটির দিকে পূর্বনাওডোবার জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত আরও এক কিলোমিটার এলাকা তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বর্ষার সময় পানির প্রবাহ শুরু হলে ওই জিরোপয়েন্ট এলাকা থেকে কুন্ডেরচর পর্যন্ত অন্তত ১১ কিলোমিটার নদী ভাঙ্গনের হুমকিতে রয়েছে। পদ্মার আগ্রাসী থাবায় পড়েছে পূর্বনাওডোবা, পালেরচর, বড়কান্দি, জাজিরা, বিলাশপুর ও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের গ্রামগুলো। এর আগে গত তিন বছরে নদী ভাঙনে জাজিরার ওইসব এলাকার ২ হাজার ৬৭০টি সরকারি-বেসকারি স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলিীন হয়েছে।
পাউবো সূত্র আরও জানায়, পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের জিরোপয়েন্ট থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি এলাকা পর্যন্ত ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ১ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার ওই প্রকল্প প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই শেষে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।বড়কান্দি ইউনিয়নের রঞ্জন ছৈয়ালকান্দি গ্রামটি গত চার বছরে পদ্মার ভয়াল থাবায় বিলীন হওয়ার পথে। ওই গ্রামের বাসিন্দা লোকমান হোসেনের একটি বসতবাড়ি ও ছয় একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পরে তিনি প্রায় ৬০০ মিটার দূরে গিয়ে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করেন। নদীর তীর ভাঙতে ভাঙতে নতুন বাড়ির কাছে চলে এসেছে।
লোকমান হোসেন বলেন, পদ্মা নদী আমাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। চার বছর আগে বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি এবং ভিটামাটি হারাতে হয়েছিল। থাকার মাত্র একটি ঘর ছিল। সেই ঘরটিও পদ্মার বুকে চলে গেলো। ভয়ে নদীর তীর থেকে দূরে বাড়ী করেছি নতুন করে। কিন্তু সেখানে এসেও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। নতুন করে বাড়ীর সামনে থেকে ভাঙতে ভাংতে নদীর তীরে এসে অনেক আতংকের মধ্যে আছি। টাকা-পয়সাও হাতে নেই যে নতুন করে আবার বাড়ী বানাবো। এবার ভরা বর্ষা মৌসুমের আগে ভাংগন রোধে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।
বড়কান্দির মীর আলী মাদবরকান্দি গ্রামের মকবুল হোসেনের ফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন বসতবাড়ি ভাংনের হুমকিতে পড়েছে।
মকবুল হোসেন বলেন, গত তিন-চার বছর ধরে এখানে ভাঙনের তীব্রতা বেশি। সব কৃষি জমি পদ্মার ভাঙনে হারিয়েছি। এখন বসতবাড়ি বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত ভাঙন রোধের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, শরীয়তপুরে জাজিরার কিছু অংশে এখনো বর্ষা আসলেই ভাংন দেখা দেয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা জাজিরার পূর্বনাওডোবা, পালেরচর, বড়কান্দি, জাজিরা, বিলাশপুর ও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের নদীর তীরে জিওব্যাগ ডাম্পিং করে থাকি।এবছর মাত্র পানির প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। এবারও আমরা জিও ব্যাগ ফেলবো। তাছাড়া তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিছুদিন আগে পরিকল্পনা সচিব এসে পরিদর্শন করে গিয়েছেন। আশা করি, এবছর ডিসেম্বরে প্রকল্পটি পাস হলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। তখন আর ওইসব গ্রামের মানুষের ভোগান্তি হবে না।












