জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। তবে সবক’টি আসনেই ভাগ বসাতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী। সরজমিন ঘুরে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ-৩ ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ১০ দলীয় জোটের নতুন প্রার্থী ঘোষণা দেয়ায় আসন দু’টিতে বিএনপি’র জয় অনেকটাই নিশ্চিত। আর বাকি চারটি আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা থাকলেও সিরাজগঞ্জ-৪ ও সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াত জয়ী হবে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। অবশ্য এ আসন দু’টিতে জামায়াতের বেশ আধিপত্য রয়েছে। এর সঙ্গে তারা আরও সিরাজগঞ্জ-২ আসনটি যোগ করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন।
সিরাজগঞ্জ-১ (কাজিপুর ও সদরের একাংশ): আসনটি বরাবরই ছিল আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছে বিএনপি-জামায়াত। এ আসনে ১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে শফিকুল ইসলাম নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৬, ১৯৯১, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছোট ছেলে মোহাম্মদ নাসিম, ১৯৯৬ সালের উপ-নির্বাচনে বড় ছেলে মোহাম্মদ সেলিম এবং ২০০৮, ২০২০ সালের উপ-নির্বাচন ও ২০২৪ সালে মোহাম্মদ নাসিমপুত্র প্রকৌশলী তানভীর শাকিল জয় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জয়লাভ করেন। আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এ আসনে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ আসনে এবার মোট ছয়জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তবে মূল আলোচনায় রয়েছে বিএনপি’র সেলিম রেজা ও জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা শাহীনুর আলম। আসনটিতে মোট তিন লাখ ৮৫ হাজার ২৪ জন ভোটার রয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ-২ (সিরাজগঞ্জ সদর ও কামারখন্দ): এটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন। এ আসনে বরাবরই এগিয়ে আছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি ১৯৮৬ ও ২০০১ সালে এ আসন থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী ২০০৮ সালে আইনি জটিলতায় তিনি নির্বাচন করতে পারেননি। পরে তার সহধর্মিণী বর্তমান জেলা বিএনপি’র সভাপতি রুমানা মাহমুদ নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের একতরফা নির্বাচনে ডা. হাবিবে মিল্লাত ও সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের জান্নাত আরা হেনরী সংসদ সদস্য হন। এর আগে ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে মির্জা মুরাদুজ্জামান ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ নাসিম জয়ী হন।
কিন্তু গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বদলে গেছে ভোটের মাঠের সমীকরণ। নয়া সমীকরণে আলোচিত হচ্ছে দীর্ঘদিনের জোট সঙ্গী বিএনপি-জামায়াতের দুই প্রার্থী। উভয় দল নিজ নিজ ভোট ব্যাংকের বাইরে সাধারণ ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। সেই হিসেবে দলের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজও ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। ফলে বিএনপি’র ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ভোটের মাঠে জয়ী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর জেলা শাখার সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলটির কেন্দ্রীয় আমীর শফিকুর রহমান গত শনিবার প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে একটি জনসভাও করেছেন।
সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ ও তাড়াশ): এটি বিএনপি’র আসন হিসেবেই পরিচিত। বিএনপি থেকে মনোনীত হয়ে ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, জুন ১৯৯৬ সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত প্রয়াত আব্দুল মান্নান তালুকদার। তবে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন তিনি। প্রয়াত এই নেতা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন। এ আসনে বিএনপি’র প্রায় দেড় ডজন প্রার্থী দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে দল জেলা বিএনপি’র তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং রায়গঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি আয়নুল হককে মনোনীত করেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুস সামাদকে মনোনয়ন দিলেও ১০ দলীয় জোটের নতুন প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহা: আব্দুর রউফ সরকারকে চূড়ান্ত করা হয়। ফলে বিএনপি’র বিজয় শুধু আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা বলে দাবি স্থানীয়দের। কারণ হিসেবে তারা বলছেন- জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাঠে থাকলে দ্বিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ১০ দলীয় জোটের এক অচেনা নতুন প্রার্থী চূড়ান্ত করায় বিএনপি’র জয়ী হতে আর কোনো বাধা নেই।
সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া): এ আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের দবির উদ্দিন আহমেদ, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ আব্দুল লতিফ মির্জা, ২০০৮ ও ২০২৪ সালে শফিকুল ইসলাম শফিক, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে প্রয়াত এইচ টি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন। এ ছাড়া ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আব্দুল হামিদ তালুকদার, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এম. আকবর আলী ও ১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে শামছুল আলম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী জেলার একমাত্র এ আসনে ভোটের মাঠে বিএনপি’র শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। তিনি নির্বাচনী মাঠেও বেশ সক্রিয়। আসনটিতে এবার জামায়াত চমক দেখাবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। অপরদিকে বিএনপি’র এম আকবর আলীও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এ আসনের ভোটাররা রফিকুল ইসলামকে জয়ী করলে মন্ত্রী বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দলটির আমীর মাওলানা শফিকুর রহমান।
সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি ও চৌহালী): তাঁতশিল্পসমৃদ্ধ ও যমুনায় ভাঙনকবলিত আসন এটি। ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আসনটিতে ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি প্রার্থী তিনবার, জাতীয় পার্টি দুইবার ও আওয়ামী লীগ পাঁচবার নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মফিজ উদ্দিন তালুকদার, ১৯৮৮ সালে একই দল থেকে শহিদুল ইসলাম খান, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে সহিদুল্লাহ খান এবং ২০০১ সালে এম মোজাম্মেল হক বিএনপি থেকে নির্বাচিত হন। অপরদিকে ১৯৯৬ সালের জুন ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, ২০১৪ সালে আব্দুল মজিদ মণ্ডল, পরবর্তী ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তার ছেলে আব্দুল মমিন মণ্ডল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন। যদিও ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত চৌহালী ও বেলকুচি উপজেলা পৃথক আসন ছিল। পরবর্তী ২০০৮ সালের নির্বাচনে বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলাকে একত্রিত করে সিরাজগঞ্জ-৫ আসন হিসেবে ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি’র হারানো আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে পড়েছেন দলটির রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম। কিন্তু তার বড় প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেলা নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ আলী আলম। তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বেলকুচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। স্থানীয়দের ধারণা তিনিই জয়ী হবেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, আলী আলম সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। প্রত্যেকটা পাড়া-মহল্লার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক। তাছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের তার হয়েই কাজ করছেন।
সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসন: ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে আসনটি গঠিত। আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচন বাদ দিলে এ আসনটি বরাবরই বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ আসনে এবার বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় পার্টি সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. এম এ মতিনের ছেলে ও জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টা ডা. এম এ মুহিত। তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মী ও ভোটারদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তার বিপরীতে শক্ত কোনো প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে একক রাজত্ব করছেন মুহিত। ফলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মাওলানা মিজানুর রহমানকে সরিয়ে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এনসিপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ। তিনি জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মনিরের ছেলে। আসনটিতে ১৯৮৬ সালে নুরুল ইসলাম তালুকদার জাতীয় পার্টি, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনছার আলী সিদ্দিকী বিএনপি, ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের শাহজাহান, ২০০১ সালে বিএনপি’র মঞ্জুর কাদের, ২০০৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের চয়ন ইসলাম, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের হাসিবুর রহমান স্বপন ও ২০২১ এর উপ-নির্বাচনে মেরিনা জাহান কবিতা আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।সিরাজগঞ্জের ছয় আসন













