• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ফজলে এলাহী আকবর মক্কা চুক্তিতে গেলে আমাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে

প্রকাশ: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৪
আপডেট: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৪

মক্কা চুক্তিতে গেলে আমাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ফজলে এলাহী আকবর মক্কা চুক্তিতে গেলে আমাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে

শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত

কোন বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলো?
ফজলে এলাহী আকবর: এ চুক্তির প্রেক্ষাপট বুঝতে ইতিহাসে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা থেকে পশ্চিমা শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত রাখতে ‘শিয়া-সুন্নি’ দ্বন্দ্ব সামনে নিয়ে আসে। দেড় শ বছর ধরে এই কৃত্রিম বিভাজনের কারণে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সুন্নি ব্লক এবং ইরান-ইরাক-সিরিয়াকেন্দ্রিক শিয়া ব্লকের মধ্যে সংঘাত বজায় থাকে। শিয়া ব্লকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার ‘ছাতা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বিনিময়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে।
তবে সম্প্রতি যুদ্ধের প্রথাগত ধারণা বদলে গেছে। ইরানের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানকে সামরিকভাবে কাবু করতে পারেনি। এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উপলব্ধি করে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এ বাস্তবতায় শিয়া ও সুন্নি—উভয় পক্ষের চিন্তাধারার মধ্যে একটি অভিন্ন বিন্দু তৈরি হয়। ইরান স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের সঙ্গে আরব দেশগুলোর কোনো মৌলিক শত্রুতা নেই; বরং আরব দেশগুলোয় বিদেশি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতিই সংঘাতের মূল কারণ।

এই পারস্পরিক সমঝোতা এবং জিসিসি দেশগুলোর নিরাপত্তার গ্যারান্টি থেকেই ‘মক্কা চুক্তি’র উৎপত্তি। এটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও একটি নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে। এটি মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট; ন্যাটোর মতো আক্রমণাত্মক নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদের সহযোগিতায় নিজেদের রক্ষা করা।

এতে যুক্ত তিন দেশের ভূকৌশলগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনটি দেশই সুন্নিপ্রধান এবং শক্তিশালী সামরিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও বিপদের সময়ে যৌথ নিরাপত্তা (আর্টিকেল ৫) না পাওয়ার অনিশ্চয়তা থেকে তুরস্ক বিকল্প জোটের সন্ধান করছে। অন্যদিকে প্রবল চাপ সত্ত্বেও সৌদি আরব ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’–এ স্বাক্ষর করেনি। তারা মনে করে, ইরান শক্তি হারালে ইসরায়েল ভবিষ্যতে তাদের জন্যই হুমকি হবে। আর এই জোটে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি মূলত তাদের পারমাণবিক শক্তি, দীর্ঘ যুদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার কারণে। মূলত এ তিন দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের মেলবন্ধনই মক্কা চুক্তির মূল চালিকা শক্তি।

বাংলাদেশে কোন প্রেক্ষাপটে মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে?
ফজলে এলাহী আকবর: প্রথমত, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ছোট দেশ এবং চারপাশে কোনো মুসলিম প্রতিবেশী নেই। প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা দেওয়ার মতো পাহাড় বা মরুভূমি না থাকায় আমাদের ‘কৌশলগত গভীরতা’ অত্যন্ত কম। কোনো যুদ্ধ শুরু হলে বহির্বিশ্বের ওপর অতি নির্ভরশীল সরবরাহব্যবস্থার কারণে আমরা খুব একটা সুবিধা করতে পারব না। প্রতিবেশী দেশগুলো প্রতিরক্ষায় আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করলেও আমাদের সক্ষমতা সেখানে খুবই সীমিত।
দ্বিতীয়ত, গত ৫৫ বছর বিশ্বশান্তি সমর্থনের কূটনৈতিক নীতি মেনে চলেও আজ আমাদের কোনো অকৃত্রিম মিত্র নেই, যারা সংকটে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াবে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যেও এমন কেউ নেই যে আমাদের পক্ষে দাঁড়াবে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’ নীতি অনুসরণের ফলে বাস্তবে আমাদের কোনো প্রকৃত বন্ধু নেই। ফলে আমরা একধরনের বৈশ্বিক একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি।

তৃতীয়ত, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের ভূমিকা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মক্কা চুক্তির প্রতি আগ্রহের পেছনে মূলত ভারতের মনোভাব দায়ী। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতাদের থেকে আসা ক্রমাগত হুমকি ও অবমাননাকর বক্তব্য বাংলাদেশে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। বছরের পর বছর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চেষ্টার পরও এই বৈরী আচরণের কারণে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি নতুন ‘নিরাপত্তা–ছাতা’ খোঁজা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

সম্ভবত প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের মনোভাব ইতিবাচক। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ফজলে এলাহী আকবর: হ্যাঁ, এটি নিশ্চিতভাবেই প্রথমবারের মতো আমাদের কোনো প্রতিরক্ষা জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। তবে আমার মতে, এই চুক্তির ব্যাপ্তি কেবল সামরিক সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে যখন কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়, তখন তাদের জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও একটি নির্দিষ্ট স্তরে উন্নীত করতে হয়।
বর্তমানে মক্কা চুক্তির কেন্দ্রে থাকা তুরস্ক বা সৌদি আরব এবং ভবিষ্যতে যোগ দিতে আগ্রহী দেশগুলো আর্থিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমরা যদি এই জোটের সদস্যপদ গ্রহণ করতে সক্ষম হই, তবে জোটের সদস্য হিসেবে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সহযোগিতার দুয়ার খুলে যাবে। জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও এক অনন্য সুযোগ বয়ে আনবে।

আপনি এই চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো বললেন, কিন্তু এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের যুক্ততার কোনো ঝুঁকির দিক আছে কি?
ফজলে এলাহী আকবর: এই চুক্তির ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই অতিরঞ্জিত। ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’ বা যৌথ নিরাপত্তার উদাহরণ টেনে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন যে এক দেশ আক্রান্ত হলে সবাইকে বাধ্যতামূলক যুদ্ধে নামতে হবে। অথচ ন্যাটোর বহু দশকের ইতিহাসে এই ধারা কেবল নাইন-ইলেভেন হামলার পরই একবার প্রয়োগ করা হয়েছিল; সদস্যদেশগুলোর ছোটখাটো সংঘাতের সময় বাকি সব দেশ যুদ্ধে জড়ায়নি। তাই এই চুক্তিতে যোগ দিলে আমরা ভারত বা পাকিস্তানের সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব—এমন ভয় অমূলক। তা ছাড়া চুক্তির ধারাগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এগুলো চূড়ান্ত হলে যাচাই-বাছাই করে আমরা আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারব।
প্রথম আলো: এই চুক্তির আলোচনা শুরুর পর থেকেই ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ভারতের এই উদ্বেগকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখবে?
ফজলে এলাহী আকবর: মনে রাখতে হবে, আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের জন্য কোনটি কল্যাণকর, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার আমাদের আছে। বর্তমান সরকারের নীতিও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। ভারত প্রতিবেশী হিসেবে তাদের উদ্বেগের কথা জানাতেই পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আমাদের। আমাদের যা দরকার তা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। তা নিশ্চিত করা গেলে কোনো হুমকিতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এর মধ্যে মক্কা চুক্তি কি আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি করবে?
ফজলে এলাহী আকবর: আপাতদৃষ্টিতে কোনো জটিলতা হওয়ার কথা নয়; বরং এখানে একটি সাধারণ স্বার্থ রয়েছে। চীন শিয়া-সুন্নি বিভেদ কমিয়ে সৌদি আরব ও ইরানকে এক করার চেষ্টা করছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা থাকলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এ উদ্যোগকে একটি ‘সাহসী পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নির্বাচন এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে চায়। ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধাবস্থা কমে এলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও স্বস্তিদায়ক হবে। বাংলাদেশ এখানে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করছে।

যেকোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া কী হওয়া উচিত?
ফজলে এলাহী আকবর: জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত দিনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বহু চুক্তির বিস্তারিত গোপন থাকলেও মক্কা চুক্তির মতো বড় ইস্যুতে লুকোচুরির সুযোগ নেই। চুক্তির প্রতিটি শর্ত ও ধারা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। সংসদ, রাজনৈতিক দল ও সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। গণতন্ত্রে জনগণই প্রধান শক্তি, তাই জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটিয়েই এ কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া সমীচীন।
আ/আ


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com