ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৫৫ বছরে কত সরকার এলো আর গেলো। ক্ষমতায় যারা গিয়েছেন বা যারা ক্ষমতাসীনদের আশেপাশে বা নিদেনপক্ষে আশীর্বাদে ছিলেন তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে, অনেকে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন কিন্তু জনগণের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। তারা যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই অনেকটা রয়ে গেছেন। বরং ইতিহাসের পরিক্রমায় জনগণের অধিকার, স্বার্থ ও স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। দেশ, স্বাধীনতা, সংবিধান ও রাষ্ট্র সবই সাধারণ জনগণকে ঘিরে। অথচ সেই সাধারণ জনগণই হোন সব সময় অবহেলিত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত। ক্ষমতাসীনদের বলয়ের বাইরে থাকা মানুষের সাথে রাষ্ট্র অনেক সময় এমন অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করে যা শুনে স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত হতে হয়।
সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। খোদ সংবিধান বলেছে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং জনগণের অভিপ্রায়সম্মলিত সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। অথচ এই সংবিধান বলবৎ থাকা অবস্থায় পতিত সরকারের সময় স্বাধীন রাষ্ট্রে নাগরিকের গুম, খুন, অপহরণ ও হত্যা চলেছে বছরের পর বছর। চলেছে এনকাউন্টার ও ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আয়না ঘর বানিয়ে নাগরিকদের বছরের পর বছর নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে রাখা হয়েছে। জোর করে তুলে নিয়ে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। জঙ্গি নাটক সাজিয়ে দরিদ্র ও নিরপরাধ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে এগুলো কল্পনা করা যায়? এমনটি চলেছে বছরের পর বছর – দেড় দশকের উপর – অথচ দেশে আইন ছিল, সংবিধান ছিল, আদালত ছিল, ছিল মানবাধিকার কমিশন নামে দন্তহীন এক বাঘ !
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা দেয়া। তাদের হবার কথা ছিলো জনগণের বন্ধু, অথচ তারাই মানুষকে খুন করেতো, অপহরণ করতো, গুম করতো অবলীলায়। নির্মমভাবে খুন করে লাশ নদীতে ফেলে দিতো। লাশ যাতে ভেসে উঠতে না পারে সেজন্য পেট কেটে পেটের সাথে ইট বা বালির বস্তা বেঁধে দিতো! অনেক সময় লাশকে ইটের ভাটায় ঢুকিয়ে দেয়া হতো যাতে আগুনে তা পুড়ে ভস্মীভূত বা ছাই হয়ে যায়। কোন কোন সময় লাশকে রেল লাইনের উপর রেখে দিতো যাতে করে লাশ চূর্ণবিচূর্ন হয়ে যায়। অনেক সময় জীবন্ত মানুষকে দ্রুতগতিতে আসা বড় গাড়ি বা ট্রাকের সামনে ফেলে দেয়া হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এমন লোমহর্ষক বহু ঘটনার তথ্য ও উপাত্ত বেরিয়ে এসেছে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন গুম কমিশনের তদন্ত রিপোর্টে। স্বাধীন দেশে এগুলো ভাবা যায়!
দুর্নীতি জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহমান। দেশের এমন কোন বিভাগ বা দপ্তর নেই যেখানে দুর্নীতি নেই বা দুর্নীতি হয় না। দুর্নীতির মহামারীতে সাধারণ জনগণ অতিষ্ঠ, তারা দুর্নীতিবাজদের কাছে রীতিমতো জিম্মি। অফিস আদালতে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ফাইল নড়ে না ঘুষ না দিলে। এক সময় ঘুষকে বলা হতো বখশিস, নেয়া হতো গোপনে। আর এখন? এখন তো ঘুষকে স্পীড মানি হিসেবে বলে তা নেয়া হয় অনেকটা প্রকাশ্যে। নাগরিক সেবা দেয়ার নূন্যতম মন-মানসিকতা গড়ে উঠেনি সরকারি অফিসগুলোতে ফলে সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তারা জনগণের সাথে অমানবিক আচরণ করে চলছেন। বেশিরভাগ সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের আয়ের সাথে তাদের অর্জিত সম্পদের কোন সামঞ্জস্য নেই। লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ব্যাপক লুটপাট করে দেশের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে।
এক সময় রাজনীতি ছিল প্রকৃত জনসেবা ও ত্যাগের জায়গা। রাজনীতিতে রাজনীতিবিদরা আসতেন দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদেরকে বিলিয়ে দেয়ার জন্য। অর্থ, বিত্ত ও সম্পদের প্রতি তাদের কোনো লোভ, লালসা বা মোহ ছিল না। ফলে বাস্তব জীবনে আর্থিকভাবে তারা থাকতেন অসচ্ছল, অনেকটা গরীব হালতে। চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকে শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীকে যদি ধরি বা স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিব বা শহীদ জিয়াকেও যদি ধরি তাদের কোরো সম্পদ ও অর্থের মোহ দেখতে পাওয়া যায় না। তাদের রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বা সমালোচনা হয়তো ছিল বা থাকতেই পারে, কিন্তু আর্থিকভাবে তারা সৎ ছিলেন না এমন কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি বা শুনা যায়নি।
আর এখন? এখন তো রাজনীতি চলে গেছে নব্য গজিয়ে উঠা ব্যবসায়ীদের হাতে। রাজনীতি যেন হয়ে গেছে টাকা বানানো বা টাকা কামানোর চরনভূমি। এখানে ক্ষতি বা লোকসানের সম্ভাবনা নেই। এখানে আছে শুধু লাভ আর লাভ, ত্বরিত গতিতে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার অবারিত সুযোগ। এখন শুধু নির্বাচন আসলে মনোনয়ন বানিজ্য হয় না, নির্বাচন মওসুম ছাড়াও ব্যাপকভাবে কমিটি বানিজ্য হয় – ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটি পর্যন্ত দেয়া হয় টাকার বিনিময়ে। চিন্তা করতে পারেন, কোটি কোটি টাকায় মনোনয়ন বিক্রি হয়। এরপর নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। এভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এমপি হলে তার কত কোটি টাকা যে তুলতে হবে পরবর্তী পাঁচ বছরে তা সহজেই অনুমেয়। এমন গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আমার চেয়েছিলাম? ক্ষমতার লিপ্সা ও রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন রাষ্ট্রকে জনগণের প্রতি চরম অমানবিক হয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
নৈতিক অবক্ষয়ের প্রাদুর্ভাব যেন চলছে দেশ ও সমাজে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধগুলো যেন সমাজ থেকে উঠে গেছে। বয়োজেষ্ট্যদের সম্মান প্রদান, ছোটদের স্নেহ, অন্যের বিপদে তার সাহায্যার্থে এগিয়ে যাওয়া, অপরের কল্যানে স্বার্থকতা খোঁজা, শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, সর্বাবস্থায় আইন মানার মন-মানসিকতা এসব মূল্যবোধ ছিল সমাজের বেসিক ফেব্রিক। এগুলো যেন আজ আস্তে আস্তে সমাজ থেকে উদাও হয়ে যাচ্ছে। অন্য বিপদে পড়লে সাহায্যের পরিবর্তে বরং এখন সেল্ফি তুলে সামাজিক গণমাধ্যমে পোস্ট বা শেয়ার করাকে শ্রেয় মনে করা হয়! অপরের কল্যান নয় বরং যে কোন উপায়ে টাকা বানানো এবং অপরকে ঠকিয়ে হলেও টাকা উপার্জনকে অতি সাধারণ ব্যাপার বলে মনে করা হচ্ছে।
সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সমাজে চলছে খাই খাই অবস্থা, অনেকটা কারে মেরে কারে খাবে! এ যেন এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে দেশে। একটু নিয়ম-শৃঙ্খলা মানা, ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি দেখে দাঁড়িয়ে থাকা, নিম্নস্বরে কথা বলা ও ভদ্র আচরণ এবং অপেক্ষমান লাইনে (কিউতে) থাকাকে বিষন দূর্বলতা মনে করা হয়। এগুলোর বিপরীতে বরং উল্টো কাজ করাকে বাহাদুরি ভাবা হয়। ছোটখাটো বিষয়ে মিথ্যা বলা, কোন জিনিসকে অযথা বাড়িয়ে বলা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা, কথা ও আশ্বাস দিয়ে ভঙ্গ করা প্রভৃতি বিষয়গুলোকে একবারে সাধারণ মামুলি বিষয় হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
৫৫ বছরে অনেক হয়েছে। ব্যাস, আর না। এবার থামুন! সবাই মিলে আসুন আমরা বাংলাদেশকে একটি মানবিক জাতি রাষ্ট্র (Nation State) হিসেবে গড়ে তুলি। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে এক নাগরিক হবে অন্য নাগরিকের কল্যাণকামী ও শুভাকাঙ্খি। সবাই একে অপরের প্রতি থাকবে শ্রদ্ধাশীল, সবাই হবে আইনের চোখে সমান এবং কেউ আইনের ব্যথ্যয় ঘটালে আইনের মধ্যে থেকে আদালত তা ডীল করবে নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে। এমন দেশ বানাতে পারলেই কেবল এক সাগর রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীন দেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রাপ্ত নতুন মানবিক বাংলাদেশের স্বাদ পাবো।
জাতীয় নৈতিক চরিত্র আইনের চেয়ে শক্তিশালী। দেশ ও সমাজের জন্য আইন অবশ্যই দরকার। তবে শুধু মাত্র আইন দিয়ে একটি দেশের তাবৎ নাগরিকদের অপরাধ বন্ধ করা যাবে না বা তাদেরকে সঠিক ও সৎ পথে রাখা যাবে না। আইন যা করতে পারবে না ইস্পাত কঠিন জাতীয় নৈতিক চরিত্র কোটি কোটি মানুষকে সেটা অনায়াসে পরোক্ষভাবে করতে বাধ্য করতে পারে। একটি মানবিক রাষ্ট্র তখনই গঠন করা সম্ভব যখন রাষ্ট্রের নাগরিকরা উন্নত নৈতিক বলে বলিয়ান হবেন। আর উন্নত জাতীয় নৈতিক চরিত্র গঠনে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের ভূমিকা অপরিসীম। রাষ্ট্রের যারা কর্নদার বা যারা অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিবেন তাদের এই বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সম্ভাবনা দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। হাজারো শহীদের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে এসেছিল দেশ গড়ার নতুন এক মহা সুযোগ। মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি না। এই অবারিত সুযোগকে হাতছাড়া করলে আমাদের জীবদ্দশায় এমন সুযোগ হয়তো আর আসবে না। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছু্ঁড়ি না করে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাঁদে কাঁদ মিলিয়ে কাজ করা দরকার। পতিত ফ্যাসিবাদ মরণকামড় দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে ফনা তুলছে। যদি কোনোভাবে পতিত ফ্যাসিবাদি ফিরতে পারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির কাউকেই ছেড়ে দিবে না। এমন পেক্ষাপটে – সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে কাঁদে কাঁদ মিলিয়ে কাজ করবে – জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এই প্রত্যাশা।
নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email:
ahmedlaw2002@yahoo.co.uk












