শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গুরুত্ব প্রায়ই সেখানে আবিষ্কৃত গ্যাসের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়। তবে এই সম্পদের প্রকৃত কৌশলগত মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায়।
মিসরের ‘জোহর’, ইসরায়েলের ‘তামার’ ও ‘লেভিয়াথান’ এবং সাইপ্রাসের ‘আফ্রোদিতে’, ‘গ্লকাস’ ও ‘ক্রোনোস’ গ্যাসক্ষেত্রগুলো এই অঞ্চলে এক বিশাল সম্পদের ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু এই সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে মিসর। কারণ, এই অঞ্চলের একমাত্র বৃহদাকার ‘লিকুইফ্যাকশন ফ্যাসিলিটি’ দুটো মিসরের ইদকু ও দামিয়েত্তাতেই অবস্থিত।
ইসরায়েল ইতিমধ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে মিসরে গ্যাস পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে সাইপ্রাসের ‘ক্রোনোস’ ক্ষেত্রের গ্যাসও মিসরের অবকাঠামো ব্যবহার করে রপ্তানির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য উৎপাদন, সুরক্ষিত পাইপলাইন এবং টেকসই চুক্তির মাধ্যমেই কেবল এ অঞ্চলটি ইউরোপকে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেই জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ভূরাজনীতি এখনো এই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ রয়েই গেছে, সাইপ্রাস বিভক্ত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজ নিজ সুবিধামতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তুরস্কের ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নীতি গ্রিস ও সাইপ্রাসের নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
অন্যদিকে তুর্কি সাইপ্রাসবাসীর দাবিকে উপেক্ষা করে নেওয়া যেকোনো লাইসেন্সিং সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছে আঙ্কারা।
২০১৯ সালে শুরু হওয়া এবং ২০২০ সালে আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘ইস্ট মেডিটেরেনিয়ান গ্যাস ফোরাম’ (ইএমজিএফ) মিসর, সাইপ্রাস, গ্রিস, ইসরায়েল, ইতালি, জর্ডান ও ফিলিস্তিনকে এক ছাতার নিচে এনেছে। তবে এতে তুরস্কের কোনো স্থান হয়নি। এতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার হলেও আঙ্কারাকে বাইরে রাখায় বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
মিসরের সুবিধা অনেক, তবে তা একচ্ছত্র নয়। দেশটির এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইন সংযোগ এবং সুয়েজ খালের ভৌগোলিক অবস্থান কায়রোকে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাড়তি শক্তি দিয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস এবং দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মিসরকে আবারও এলএনজি আমদানি শুরু করতে হয়েছে। ফলে রপ্তানির জন্য তাদের কাছে গ্যাস থাকছে কম।
নিজের প্রসেসিং প্ল্যান্টগুলো সচল রাখতে মিসরের প্রয়োজন ইসরায়েল ও সাইপ্রাসের গ্যাস। অন্যদিকে ওই উৎপাদক দেশগুলোরও মিসরের অবকাঠামো প্রয়োজন, যাতে তাদের নতুন করে কোটি কোটি ডলার খরচ করে আলাদা রপ্তানি ব্যবস্থা গড়তে না হয়। ফলে সমুদ্রের তলদেশের গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা কার, তার চেয়ে প্রসেসিং ও পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেটাই এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিরয়টার্স
তুরস্ক-মিসর জ্বালানি সহযোগিতা
তুরস্ক এই সমীকরণে ঢুকছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কোণ থেকে। দেশটির নিজস্ব গ্যাস সম্পদ চাহিদার তুলনায় বেশ কম। তবে বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, এলএনজি টার্মিনাল, ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্নবীকরণ ইউনিট, গ্যাস ধারণক্ষমতা এবং ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ আঙ্কারাকে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক বা ট্রানজিট হাব হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মিসরের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলার পর দুই দেশের মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার এক নতুন পথ খুলেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের বোটাশ এবং মিসরের ইগাস গ্যাস ও এলএনজি বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কারিগরি দক্ষতা বিনিময়ে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে একটি চুক্তির অধীনে গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে মিসরকে সেবা দিতে একটি তুর্কি এফএসআরইউ জাহাজ পাঠানো হয়। এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক ও সামুদ্রিক সীমানাবিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের পরিপূরক অবকাঠামো একে অপরের স্বার্থে কাজে লাগানো সম্ভব।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে এই জোটের একটি স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কারিগরি বিষয়গুলো মিটে গেলে মিসর পরে এতে যোগ দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও এই সম্ভাবনার কথা নাকচ করেননি।
মক্কা চুক্তি ও আঞ্চলিক করিডর
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এই পরিবর্তনশীল সমীকরণে একটি নতুন প্রতিরক্ষা মাত্রা যোগ করেছে। তিনটি দেশই এটিকে একটি আত্মরক্ষামূলক জোট হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং নতুন সদস্যদের জন্য এর দরজা খোলা রেখেছে। সম্মিলিত প্রতিরক্ষার অনুচ্ছেদের কারণে ন্যাটোর সঙ্গে এর তুলনা করা হচ্ছে, যদিও এই জোটের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক সমন্বয় এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে।
আপাতত এই চুক্তিকে তিনটি আঞ্চলিক শক্তির একতাবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো মার্কিন নিরাপত্তার অনিশ্চয়তার মুখে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং ইরান ও ইসরায়েলি প্রভাবকে মোকাবিলা করা।
এই চুক্তিতে জ্বালানি–সংক্রান্ত প্রকাশ্য কোনো অনুচ্ছেদ নেই। তাই এটি রাতারাতি জ্বালানিপ্রবাহ বদলে দেবে—এমন দাবি করার সুযোগ কম। তবে প্রতিরক্ষার এই সমন্বয় অন্য জায়গায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন সামুদ্রিক নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং বন্দর, পাইপলাইন, এলএনজি প্ল্যান্ট ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা দেওয়া।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুনে ‘নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট’ প্রস্তাবিত ‘ফোর সিজ ইনিশিয়েটিভ’ বড় সুযোগের পাশাপাশি অতিরঞ্জিত আশার ঝুঁকিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এই প্রস্তাবে সিরিয়া ও তুরস্ককে মাধ্যম করে পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরকে একটি বিশাল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬রয়টার্স
এর সম্ভাব্য উপাদানের মধ্যে রয়েছে উপসাগর-ভূমধ্যসাগর এবং ইরাক-সিরিয়া করিডর এবং বিখ্যাত ‘আরব গ্যাস পাইপলাইন’-এর পুনরুজ্জীবন। এই মডেলে তুরস্ক হবে ইউরোপের প্রবেশদ্বার, উপসাগরীয় অঞ্চলের পুঁজি দিয়ে হবে পুনর্নির্মাণ, আর সিরিয়া পাবে মোটা অঙ্কের ট্রানজিট রাজস্ব।
হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় বিকল্প স্থলপথ খোঁজারই অংশ হিসেবে সৌদি-জর্ডান-সিরিয়া-তুরস্ক রেললাইনের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এর কোনোটিই এখনো অর্থায়িত জ্বালানি করিডর নয়। মক্কা চুক্তি হয়তো রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুটা সহজ করেছে, কিন্তু এই পরিকল্পনাগুলো মক্কা চুক্তির সৃষ্টি নয়, আর এটি এর বাস্তবায়নও সুনিশ্চিত করে না।
এই তিন সহযোগীর কাছে তিনটি ভিন্ন সম্পদ রয়েছে: সৌদির প্রচুর অর্থ ও জ্বালানি, তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনীতি ও সামরিক শিল্প সক্ষমতা, এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। এদের মেলাতে গেলে রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়েও বেশি কিছু লাগবে।
সিরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, অনিশ্চিত আইনি ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা সংকট এখনো বড় বাধা। জর্ডান থেকে উত্তর দিকে আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু করা ‘আরব গ্যাস পাইপলাইন’ এখানে একটি বড় উদাহরণ। মানচিত্রে পাইপলাইন থাকলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা যেকোনো প্রকল্পের গতি থামিয়ে দিতে পারে।
আ/আ












