ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ, লন্ডন
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প শক্তি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে অন্য কোনো দলের পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো সংগঠন, জনসমর্থন কিংবা কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
ভারতের ভূমিকাটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ভারত পরোক্ষভাবে বিএনপি ও জামায়াতের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে, মূলত নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য। নানা তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জিয়া হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহুদিনের। আবার কিছু তথ্যে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ভূমিকার কথাও উঠে আসে—যেখানে শেখ হাসিনার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। যদিও এগুলো বিতর্কিত ও অভিযোগের পর্যায়ে, তবু রাজনৈতিক ইতিহাসে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরও ভয়াবহ।
১. তারেক রহমানকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে দেশছাড়া করা হয়,
২. এক কাপড়ে খালেদা জিয়াকে নিজ বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়,
৩. জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচারিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়,
৪. দলটির সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়,
৫. উভয় দলের অসংখ্য নেতাকর্মী খুন, গুম ও নির্যাতনের শিকার হন।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনার শাসনের পেছনে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল—এ নিয়ে জনমনে কোনো বড় সন্দেহ নেই। ফলে দুটো দলই—বিএনপি ও জামায়াত—একইভাবে নির্যাতিত হয়েছে এবং তাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম মূলত একটি আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
হাসিনা বিতাড়িত হওয়ার পর বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে ভারতের জন্য হাসিনার মতো নির্ভরযোগ্য বিকল্প আর কেউ নেই। এ কারণেই ভারতের কৌশলগত সংকট তৈরি হয়েছে। তারা এমন একটি রাজনৈতিক শক্তিকে চায়, যারা একদিকে ক্ষমতায় যেতে পারবে, অন্যদিকে ভারতের স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করবে না।
বিএনপি সম্পর্কে একটি প্রচলিত কথা আছে—এটি “সকল ঘরানার মানুষের দল”; অর্থাৎ এখানে একই সঙ্গে হ্যাঁ আর না–এর সহাবস্থান। সম্ভবত এটিই বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। একটি রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট আদর্শ থাকা স্বাভাবিক। সমাজতন্ত্র বা ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক দলগুলো অন্তত তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায়—
তাদের আদর্শ কী?
তারা কোন পথে যেতে চায়?
আস্তিক–নাস্তিক, বাম–ডান, সমাজতান্ত্রিক–ইসলামী—সব ঘরানার মানুষের সমন্বয়ে দলটির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা কোথায়?
এই আদর্শিক অস্পষ্টতাই বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মূল।
গত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য কার্যত বহাল। এই আধিপত্য থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মানুষ বুক বেঁধেছিল, আশা করেছিল একটি স্বাধীন, স্বার্থনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার। কিন্তু সেই সময়ে বিএনপি ভারতের সঙ্গে আপস করে দেশের মানুষের প্রত্যাশার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে—এমন অভিযোগ এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
অন্যদিকে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াত নিজেদেরকে জনগণের পক্ষে অবস্থানকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বলা যায়—
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি যে অবশ্যম্ভাবী বিজয়ের পথে ছিল, সেই সম্ভাবনা এখন ক্রমেই অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ে রূপ নিচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে।
রাজনীতি শূন্যতা সহ্য করে না। আদর্শিক স্পষ্টতা, জনগণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা—এই তিনটি বিষয়ই ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল নির্ধারক হবে। বিএনপি যদি এখানেই সিদ্ধান্তহীন থাকে, তবে ইতিহাস তাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।












