শেখ বিবি কাউছার
খাটি শুরু করছি স্বামীজি বিবেকানন্দের একটি কথা দিয়ে। তিনি বলেছেন, “এসো মানুষ হও, সংকীর্ণ গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে গিয়ে দেখো, সব জাতি কেমন উন্নতির পথে চলছে। আর তোরা কী করছিস? এত বিদ্যা শিখে পরের দোরে ভিখারির মতো ‘চাকরি দাও’ ‘চাকরি দাও’ বলে চেঁচাচ্ছিস।”
তিনি সেই একশ বছর আগে শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া প্রয়োজন তা চিন্তা করে গেছেন। তিনি যুবকদের পরামর্শ দিয়েছেন কেরানি তৈরির শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হতে, যা দিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। তিনি চাকরি না খুঁজে কাজ তৈরি করার উপদেশ দিয়ে গেছেন সেই কালেই। একটি দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। সেখানে যত বড় অবকাঠামো উন্নয়নই হোক না কেন? এ উন্নয়নের ধারা তখনই অব্যাহত থাকবে যখন আমরা নতুন এবং তরুণ প্রজন্মকে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করতে পারব। তাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার ওপর। আমরা যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, তাদের বাজেট বরাদ্দের অর্ধেক অংশই থাকে শিক্ষা খাতে। আর আমাদের দেশে তার উল্টো চিত্র। শিক্ষায় আমাদের বাজেট বরাদ্দ এখনো জিডিপির ২ শতাংশের ওপরে, অথচ যেখানে হওয়ার কথা ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি নেপালও অনেক এগিয়ে।
আমাদের দেশে অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। এ প্রকল্পগুলো একটি দেশকে উন্নত দেশের কাতারে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে শিক্ষা খাতে মনোযোগটা দিতে হবে তার চেয়ে বেশি। এখন প্রশ্ন হলো, এ বিশ্বায়নের যুগে আমরা আমাদের প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কতটুকু যুগোপযোগী করে তুলতে পেরেছি? নাকি এখনো ব্যস্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার দাপট নিয়ে? এভাবে চলতে থাকলে কি আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে? নিশ্চয়ই নয়!
করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে এখনকার শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক বেশি জানে এবং বুঝে, তারা প্রযুক্তির মাধ্যমে পড়ার স্বাদ নিচ্ছে। তাই তাদের আগের মতো গতানুগতিক শিক্ষা প্রদান করলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সবসময় একই বিষয় পড়ালেও শিক্ষার্থীদের কাছে তা নতুন। একজন শিক্ষককে সবসময় জ্ঞানের অনুশীলনের মধ্যেই থাকতে হয়। একই বিষয় বারবার পড়ালেও সে সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য বা উপাদান যোগ করতে পারলেই ছাত্ররা নতুনত্ব খুঁজে পাবে শ্রেণিকক্ষে।
দেশে প্রতিদিন নতুন নতুন প্রযুক্তি যোগ হচ্ছে কিন্তু সেই অনুপাতে দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা খুব একটা যে বাড়ছে তা কিন্তু নয়। তাত্ত্বিক জ্ঞান শিখে, যখন কেউ জীবন-জীবিকায় নামে তখন একটির সঙ্গে অন্য আরেকটির মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাই আমাদের শিক্ষা কারিকুলামেও আনতে হবে পরিবর্তন। বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশই এখন স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে ঝুঁকছে বেশি। বর্তমান সরকার মানবসম্পদ উন্নয়ন ও আইটি শিল্পকে সামনে রেখে নতুন শিক্ষা অবকাঠামো যেমন টেকনোলজি পার্ক, হাই-টেক পার্ক, টেকনোলজি বিজনেস ইনকিউবেশন, বিজ্ঞান পার্ক প্রতিষ্ঠা করছে। যা অত্যন্ত যুগোপযোগী উদ্যোগ। এ প্ল্যাটফর্মগুলো সামনে কর্মসংস্থান উদ্ভাবনের জন্য শক্তিশালী অঙ্গ হিসেবে কাজ করবে।
আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সামনে দাঁড়িয়ে। মূলত চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ঘটছে ইন্টারনেটের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযোগের মাধ্যমে। আবার চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুধু ব্যবসা দিয়েই মোকাবিলা করা যাবে তা কিন্তু নয়। এ জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানী, কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক। আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানী ও গবেষক দরকার। যারা ভালো শিক্ষার্থী, তারা উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিদেশে চলে যাচ্ছে, তাদের দেশে থাকার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সরকার যেমন বড় বড় প্রকল্প নিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি শিক্ষা নিয়েও বড় প্রকল্প নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষা নিয়ে বড় পরিকল্পনা করা প্রয়োজন বাজেটে। তারপর প্রয়োজন ধাপে ধাপে ডিজিটাল বৈষম্য কমানো।
বর্তমান সময়ে মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ছাড়া আমরা একমুহূর্তও কল্পনা করতে পারি না। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯-এর দুঃসময়ে জুম, স্ট্রিমইয়ার্ড, ওয়েবিনার, গুগল ক্লাসরুম, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রভৃতি শব্দগুলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতাকেই যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে।
একুশ শতকে একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি সফট ও হার্ড স্কিলের ওপর জোর দিতে হবে বেশি। কারণ এ দক্ষতাগুলো ব্যতীত বর্তমান ডিজিটাল যুগে কোনো গুরুত্ব থাকবে না যে যত ভালো ফলাফলই করুক না কেন! এখানে সফট স্কিলগুলো হলো ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স, টাইম ম্যানেজমেন্ট, রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিকেশন স্কিল, প্রেজেন্টেশন স্কিল, ল্যাংগুয়েজ স্কিল, প্রবলেম সলভিং, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, রাইটিং স্কিল, লিডারশিপ স্কিল, মেন্টাল অ্যাবিলিটি, গুগলিং স্কিল।
অন্যদিকে হার্ড স্কিলগুলো হলো মাইক্রোসফট অফিস, সফটওয়্যার স্কিল (ফটোশপ ভিডিও, এডিটিং, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট) টাইপিং স্কিল, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইথিক্যাল হ্যাকিং, ম্যাথ স্কিল, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কিল। এসব দক্ষতার সঙ্গে যদি সততা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম অর্জিত হয় তাহলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল।
আমরা প্রায় সময় বলে থাকি ২১ শতকের শিক্ষার্থীদের কী কী দক্ষতা প্রযোজন; কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য তাদের যেসব যোগ্যতা বা দক্ষতা দরকার তার জন্য শিক্ষক হিসেবে আমাদের পালন করতে হবে বিরাট ভূমিকা। কারণ আমাদের যদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকে তাহলে শিক্ষার্থীদের কীভাবে জানাব বা দক্ষ করে তুলব। সে জন্য প্রয়োজন এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা অনেক পরিশ্রমী ও মেধাবী। আমরা যদি তাদের শ্রম আর মেধাকে গবেষণামূলক, উদ্ভাবনমূলক এবং সৃজনশীল কাজে লাগাতে পারি, তবেই পাব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ। তবে তাদের জন্য সুপথটা তৈরি করে দিতে হবে আমাদেরই। তাহলেই তারা শিক্ষাটা উপভোগ করে অর্জন করবে, কোনো আশঙ্কা নিয়ে নয়।
লেখক : প্রভাষক, নোয়াপাড়া কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম













