স্টাফ করেসপডেন্ট
বজ্রকঠিন মনোবল ও ইস্পাত কঠিন সংগ্রামী চেতনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ইসিলামী ঐক্যজোট। প্রচণ্ড ঝড়, তুফানের মুখেও সত্যের পথ সবসময় আঁকড়ে থাকতে হবে বলেও নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শও দিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোট এই আহ্বান জানিয়েছে।
ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যদের একটি প্রতিনিধি সংলাপে অংশ নেয়। এ সময় তারা ১১টি প্রস্তাব তুলে ধরে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সঙ্গে ইসির সংলাপ অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও দলটি আসেনি।
এ সময় স্বাগত বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, সবসময় নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে না- এ বিষয়টা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। আমরা সেই জিনিসটা নিয়ে আলোচনা করবো। আপনারাও পরামর্শ দেবেন, আমাদের কোনো সমালোচনা থাকলে সেটাও করতে পারেন।
দলটির মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ প্রস্তাবসমূহ তুলে ধরে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আপনারা করতে সক্ষম। আপনাদের মেধা, কৌশল ও বক্তব্য আমরা লক্ষ্য করেছি। ইতিপূর্বেও বড় কাজ আপনারা করেছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে কোনো কিছুই বাধা হবে না। মানুষ নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডের কথা বলে। আমরা জানি ও স্বীকার করি, আপনাদের মেরুদণ্ড অত্যন্ত শক্তিশালী।
মুফতি ফয়জুল্লাহ লিখিত বক্তব্যে বলেন, যে সংসদ দেশ, জাতি ও জনগণের কল্যাণে আইন প্রণয়ন করে এবং তার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও সংশোধনী আনার দায়িত্ব পালন করে, এমন একটি সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ভোটার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, এই নির্বাচন জাতীয় ঐক্যের চেতনার জগতকে আলোকিত করবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ণয় হবে। এই নির্বাচন জাতিকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে দেশকে উন্নতির ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তিনি বলেন, আবেগ ও উচ্ছ্বাস পরিহার করে বুদ্ধিবৃত্তিক কলাকৌশল অবলম্বন করার মাধ্যমে দুর্জয় বিশ্বাস নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে। তাই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ইসলামী ঐক্যজোট নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করছে-
১. কারো প্ররোচনায় নয় বরং অন্তরের তাগিদেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিবেকের আলোকে বিচার- বিবেচনার নিরিখে ভোট প্রদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালে প্রার্থী ও ভোটাররা যাতে শাসরুদ্ধকর এবং বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অশুভ থাবায় আক্রান্ত না হয়, সেদিকে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নির্বাচনে অনৈতিকভাবে জেতার প্রয়াসকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
২. কেন্দ্রে সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্টের নির্ভয়ে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. প্রতিটি কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল জনসমক্ষে ঘোষণা করতে হবে এবং প্রত্যেক প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সার্টিফিকেট ইস্যু বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. নির্বাচনের সময় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে স্পর্শকাতর এলাকায় সেনাবাহিনী নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে সেনাবহিনী নিয়োগ করার প্রয়োজন নেই বলে ইসলামী ঐক্যজোট মনে করে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে সব প্রার্থীর নাম, দল ও প্রতীকের উল্লেখ সম্বলিত অভিন্ন পোস্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাবেন। নির্বাচনকালে প্রার্থীদের সব ধরনের রঙিন পোস্টার, ব্যানার ও অহেতুক আঞ্চলিক অফিস স্থাপন বন্ধ করতে হবে।
৫. তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠন পর্যন্ত বিদ্যমান সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে। এমন কোনো পরিকল্পনা নিতে পারবেন না, যাতে ভোটাররা প্রভাবিত হতে পারে। ইসলামী ঐক্যজোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের আকৃতি সীমিতকরণের সুপারিশ করছে।
৬. নির্বাচনী বিরোধ পাঁচ বছরেও শেষ না হওয়ার বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করে নির্বাচনী অভিযোগ তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান করতে হবে। এজন্য হাইকোর্টে একটি পৃথক বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে।
৭. নির্বাচনকে কালোটাকা এবং পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে ইসলামী ঐক্যজোট।
৮. নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দণ্ডিত ব্যক্তিদের (দুবছর পর) সংসদ নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ বাতিল করতে হবে।
৯. যেসব দল নির্বাচনে ৩০-এর অধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে, সেসব দলকে বেতার ও টিভিসহ সরকারি প্রচার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সুযোগ দেওয়ার বর্তমান নিয়ম বহাল রাখতে হবে।
১০. সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকেও নিরপেক্ষ করতে হবে। তাই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচন কমিশন থেকে প্রত্যাহার করার প্রস্থাব করছে ইসলামী ঐক্যজোট।
১১. ইভিএমে ভোট গ্রহণের আধুনিক প্রযুক্তি বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রেই গ্রহণ করা হয়েছে। এ পদ্ধতিটি নির্ভুল-নিখুঁত হওয়া আবশ্যক। প্রযুক্তির জগতে বাংলাদেশ সবেমাত্র প্রবেশ করেছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। সুতরাং এ বিষয়ে প্রথমে জনগণের আস্থা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে বলে ইসলামী ঐক্যজোট মনে করে। নির্বাচন কমিশনকে এক্ষেত্রে জনগণের শঙ্কা কাটানোর লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। ইসলামী ঐক্যজোট আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণের এই শঙ্কা কাটানোর লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করে।












