ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ছবি প্রতিনিধি
কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। কফিনবন্দি কুয়াশার চাদর সরিয়ে শীতের ‘সূর্যি মামা’ সবে উঁকি দিয়েছেন উত্তর জনপদে; কিন্তু সেই কাকডাকা ভোরেই বিছানা ছেড়েছেন তিনি। প্রাতঃরাশ সেরেছেন দ্রুত।
কারণ কর্মসূচির তালিকা দীর্ঘ। জননেতা যখন নিজের খাসতালুকে থাকেন, তখন কি আর বিশ্রামের ফুরসত থাকে?
তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের রাজনীতির এক প্রবীণ কাণ্ডারি।
সোমবার দিনভর নিজের জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে যে ব্যস্ততায় কাটালেন বিএনপি মহাসচিব- তাকে অনায়াসেই ‘ম্যারাথন সাংগঠনিক দৌড়’ বলা চলে।
সকাল ১০টা বাজতেই শহরের তাঁতিপাড়ায় তার বাসভবন লোকে-লোকারণ্য। সংবাদমাধ্যমের ভিড় আর কর্মীদের উচ্ছ্বাস— সব মিলিয়ে সরগরম আঙিনা।
বেলা ১১টায় যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন, তরুণ কর্মীদের হুড়োহুড়িতে কিছুটা বিড়ম্বিত শোনালো বর্ষীয়ান এই নেতার কণ্ঠ। মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন, আপনাদের বুঝতে হবে আমি একজন বয়স্ক লোক, তরুণ নই। এই ধাক্কাধাক্কি সহ্য করতে পারছি না। শৃঙ্খলা ফিরলে শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব।
তবে এ দিনটি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার ছিল না, ছিল স্মৃতির সরণি বেয়ে হাঁটার। রুহিয়া থানা এলাকায় গিয়ে ফখরুল যখন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা তৈমুর রহমান ও গোলাম মোস্তফার কবরের পাশে দাঁড়ালেন, তখন আবেগ বাঁধ মানেনি। কবরের পাশে হাত তুলে মোনাজাত করার সময় চোখের জল মুছতে দেখা গেল ৭৮ বছর বয়সি এই জননেতাকে। সহযোদ্ধা হারানোর বেদনা যেন এক মুহূর্তের জন্য রাজনীতির কঠোরতাকে ছাপিয়ে গেল।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, এটি নিছক সাংগঠনিক সফর নয়। সামনেই ত্রয়োদশ নির্বাচন। তাই ঘর গোছাতে কোমর বেঁধে নেমেছেন ফখরুল দম্পতি।
একদিকে মির্জা ফখরুল যখন চষে বেড়াচ্ছেন রুহিয়া থানার কালীবাড়ি থেকে মানুর মিল কিংবা গিন্নি দেবী আগরওয়ালা কলেজ চত্বর; অন্যদিকে তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম এবং কন্যারাও নেমেছেন পাড়া-মহল্লার গণসংযোগে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী কিংবা মামুন উর রশিদদের দাবি, এটি নির্বাচনি সফর নয়, নেহাতই কর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়; কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রথ দেখা আর কলা বেচা— দুই কাজই সেরে নিচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব।
তবে পথটা যে খুব মসৃণ, তা বলা যাচ্ছে না। ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠে এবার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর তরুণ মুখ দেলাওয়ার হোসেন। তার হয়ে ময়দানে নেমেছেন তার মেজো ভাই সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলমগীর। দেলাওয়ারের পক্ষ থেকে সামাজিকমাধ্যমে রীতিমতো ‘ঝড়’ তোলা হয়েছে নিজেকে চেনাতে।
যদিও ঠাকুরগাঁওয়ের দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের কাছে ফখরুল এক ‘চেনা বামুন’। চালকল মালিক সমিতির আব্দুল্লাহ আল মামুনের কথায়- চেনা বামুনের পৈতে লাগে না। ফখরুল সাহেব আমাদের অতি আপন। অন্যদিকে দেলাওয়ারের মতো নবাগতদের কাছে সামাজিক মাধ্যমই এখন প্রধান অস্ত্র।
বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও ফখরুলের মনোবল যেন এখনো টগবগে তরুণের মতো। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তার এই সাংগঠনিক পদযাত্রা। দিনশেষে স্থানীয় এক নেতার মন্তব্য ছিল যথার্থ- ‘ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি আর ফখরুল, একে অপরের পরিপূরক।’












