জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে বরগুনায় এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম সামনে আসায় কিছুটা হলেও উজ্জীবিত হতে যাচ্ছে ঝিমিয়ে পড়া জেলা বিএনপি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে বিএনপি মনোনীত জেলা সভাপতি নজরুল ইসলাম মোল্লা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। বিজয়ী হন মাওলানা মাহমুদুল হাসান। যিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করেন। এই ফলাফল বরগুনার রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার পালাবদল এবং পরবর্তী নির্বাচনি ফলাফল বরগুনায় দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থান নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ এর প্রভাববলয়ে থাকা এ জেলায় এখন নতুন করে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর স্থানীয় রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূরণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি।
জেলা বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরাসরি নির্বাচনি আসনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর দলকে তৃণমূল থেকে পুনর্গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনে মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্য ও সক্রিয় নেতৃত্ব সামনে এলে তা শিক্ষা, আইন ও সামাজিক উন্নয়ন খাতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং তৃণমূল সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ রয়েছে এই আসনের মাধ্যমে।
সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে বরগুনায় যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও দীর্ঘদিনের সংগঠক নেত্রীরা। কেউ কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত, কেউ জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে সক্রিয়। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চলছে নানা মূল্যায়ন। এ ছাড়াও তৃণমূল সম্পৃক্ততা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে যেসব নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হচ্ছে তারা হলেন, অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, অ্যাডভোকেট রঞ্জুয়ারা শিপু, অ্যাডভোকেট মেহবুবা আক্তার জুঁই, অ্যাডভোকেট মারজিয়া হিরা, নূর শাহানা হক, শারমিন সুলতানা আসমা, নাজমুন নাহার পাপড়ি, মীরা খান ও ইসরাত জাহান রিক্তা।
এদের মধ্যে কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক আসমা আজিজ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সক্রিয়। শিক্ষাজীবন থেকেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখছেন। নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা বিষয়ক কাজ ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে তার নাম আলোচনায় রয়েছে।
আইন পেশায় সুপরিচিত মুখ অ্যাডভোকেট রঞ্জুয়ারা শিপু দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবাধিকারভিত্তিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। নারী ও শিশুসংক্রান্ত বিষয়ে আইনি সহায়তা প্রদানের অভিজ্ঞতা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে। অ্যাডভোকেট মেহবুবা আক্তার জুঁই বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ের আইনগত অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার কারণে সংশ্লিষ্ট মহলে তাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
পাথরঘাটার সন্তান অ্যাডভোকেট মারজিয়া হিরা বর্তমানে ঢাকা নারী ও শিশু আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (অ্যাডিশনাল পিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা তাকে আলোচনায় এনেছে। নূর শাহানা হক বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি শিক্ষাজীবনে সুনাম অর্জন করেন। অবসর গ্রহণের পর পূর্ণ সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। শিক্ষা বিস্তার, নারীর ক্ষমতায়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকার কারণে স্থানীয়ভাবে তিনি গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচিত।
জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী ও বরগুনা সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শারমিন সুলতানা আসমা দীর্ঘদিন সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার কারণে স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত মুখ। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নেতৃত্ব হিসেবে নাজমুন নাহার পাপড়ির নামও আলোচনায় রয়েছে। সামাজিক কর্মকাণ্ড ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে তৃণমূল পর্যায়ে পরিচিত করে তুলেছে।
আমতলীর মীরা খান দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মাঠপর্যায়ে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তৃণমূল সংগঠন সুসংগঠিত করা এবং নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তার বাবা মরহুম জাফর আলী খান আমতলী উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়াও বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফারুক মোল্লার মেয়ে জেলা মহিলা দল নেত্রী ইসরাত জাহান রিক্তার নামও আলোচনায় রয়েছে।
বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক হাসানুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বরগুনায় বিএনপি কর্মীদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে তা কাটাতে শক্ত, সমন্বয়কারী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে যিনি মনোনয়ন পাবেন তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলকে সংগঠিত করা এবং একই সঙ্গে বরগুনার নারী সমাজের অধিকার, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা। তাইতো তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদেরও প্রত্যাশা, সংরক্ষিত আসনে এমন একজন নেত্রী মনোনীত হোন যিনি দলীয় বিভাজন না বাড়িয়ে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে পারবেন।












