নিউজ ডেস্ক
‘বাবা হারানোর ছয়টি বছর কীভাবে চলে গেল বুঝতেই পারলাম না। কখনোই মনে হয় না, বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। একটি মুহূর্তের জন্য আমি বাবাকে ভুলতে পারি না। সব সময়ই মনে হয় এই বুঝি আমাকে মা বলে খাবারের টেবিলে ডাকছেন। আসলে বাবা হারানোর কষ্ট আমি কাউকে বলে বোঝাতে পারবো না। বাবা ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক, আদর্শ এবং শিক্ষাগুরু। একজন আদর্শবান বাবার সন্তান হিসেবে আমার পুরো জায়গাজুড়ে শুধুই বাবা। জীবনে কখনো কোনোদিন বাবাকে অন্যায় বা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতেও দেখিনি। সততা আর আদর্শ নিয়ে পথ চলেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ফলে জীবদ্দশায় যে কাজেই হাত দিতেন, সে কাজেই পেতেন সফলতা।’ বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে এভাবেই পিতার স্মৃতিচারণ করেন তার বড় মেয়ে মুন্নু গ্রুপের চেয়ারম্যান আফরোজা খান রিতা।
২০১৭ সালের ১লা আগস্ট সফল শিল্প উদ্যোক্তা হারুণার রশিদ খান মুন্নু না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
দেশ-বিদেশে পরিচিত হারুণার রশিদ খান মুন্নু তার জীবদ্দশাতেই বড় মেয়ে মুন্নু গ্রুপের চেয়ারম্যান আফরোজা খান রিতাকে তার নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিলেন। বাবার সেই আদর্শের দীক্ষাতেই আফরোজা খান রিতা এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। বাবার মতো তিনিও হয়ে উঠেছেন একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তা। বাবা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাবার দেয়া দায়িত্বগুলো সফলভাবে পালন করে যাচ্ছেন রিতা। বাবার মতো তিনিও মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, সংসার, ধর্মসহ সব কিছুই এক হাতে সামাল দিচ্ছেন আফরোজা খান রিতা।
বাবার আদর্র্শ, কর্ম-উদ্দীপনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিজের ভেতর লালন করেছেন বলেই বাবার হাতে গড়া মুন্নু মেডিকেল কলেজ, মুন্নু মেডিকেল অ্যান্ড হাসপাতাল, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মুন্নু নার্সিং কলেজ, হুরুন নাহার উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্নু আদর্শ বিদ্যানিকেতন, ফিরোজা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মুন্নু ফ্যাব্রিক্স লিমিটেড, মুন্নু এগ্রো অ্যান্ড মেশিনারি লিমিটেড, মুন্নু বোন চায়না লিমিটেড, মুন্নু প্যাকেজিং লিমিটেড, মুন্নু পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড, মুন্নু ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দক্ষ হাতে সামাল দিয়ে যাচ্ছেন। মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর হাতে গড়া এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ খুঁজে পেয়েছে কর্মসংস্থান। শুধু তাই নয়, বাবার হাত ধরে বিএনপি’র রাজনীতির দীক্ষা নিয়ে আফরোজা খান রিতা মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি’র রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন। পরপর দুইবার জেলা বিএনপি’র সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার দক্ষ নেতৃত্বেই চলছে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সকল কর্মকাণ্ড।
আফরোজা খান রিতা বলেন, আজ ৬টি বছর হলো বাবার মুখে পরম মমতামাখা মধুর মা ডাক থেকে বঞ্চিত আমি। বাবার অভাব আর স্মৃতিগুলো সর্বক্ষণই আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। বাবাকে হারানোর কষ্ট কাউকে বলে বোঝাতে পারবো না। বাবা চলে যাওয়ার পর মাথার ওপর থেকে বটগাছটি সরে গেছে। এখন একমাত্র অবলম্বন আমার মা। সেও অনেক দিন ধরে অসুস্থ। জীবদ্দশায় আমার বাবার যত উন্নতি ও সফলতা এসেছে তার জন্য আমার মায়ের বিরাট অবদান রয়েছে। মা পর্দার আড়ালে থেকে বাবাকে উৎসাহ দিয়েছেন। বাবার জীবনে আমার মা আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন।
পিতার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আফরোজা খান রিতা বলেন, বিএনপি’র রাজনীতিতে আমার বাবা ছিলেন একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ। রাজনীতি করতে গিয়ে নিজে কখনো অন্যায় করেননি এমনকি অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপসও করেননি। তার বড় গুণ ছিল তিনি কখনোই নিজেকে নিয়ে ভাবতেন না। তার ভাবনার মধ্যে ছিল মানুষসেবা। ক্ষমতা পেয়ে কখনোই তার অপব্যবহার করেননি। দুর্নীতি ও অনিয়মকে কোনো সময়ই প্রশ্রয় দিতেন না। মানুষের ভালোবাসা ছাড়া তার জীবনে কোনো চাওয়া- পাওয়া ছিল না। যার কারণে মানিকগঞ্জের মানুষ তাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন। বার বার বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাতেন মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য। মোট কথা আমার বাবা বিএনপি’র রাজনীতিতেও ছিলেন একজন আদর্শের প্রতীক।
এদিকে সাবেক মন্ত্রী মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর জীবনী নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। আসাদুজ্জামান রনির অনুলিখন-সংকলন-সম্পাদনা এবং আফরোজা খান রিতার প্রকাশনায় হারুণার রশিদ খান মুন্নুর ‘আমার জীবন উপাখ্যান।’ এই বইয়ের প্রত্যেকটি অক্ষরে অক্ষরে তুলে ধরেছেন তার জীবন সংগ্রামের সব গল্প। ২২৬ পৃষ্ঠার এই বইয়ের একজায়গায় মানিকগঞ্জের প্রতি তার সমস্ত আবেগ, ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে হারুণার রশিদ খান মুন্নু বলেছেন, ‘আমার সমস্ত আবেগ মানিকগঞ্জের মানুষকে ঘিরে।
তাই রাজধানীর অভিজাত এলাকা ছেড়ে এসে আমি সবকিছু গড়েছি সোঁদা মাটির গন্ধজুড়ে থাকা প্রাণের মানিকগঞ্জে। মানুষ কিছুটা সচ্ছল হওয়া মাত্রই শহরমুখী হয়। আর আমি আমার ঝলমলে পৃথিবী ছেড়ে চলে এসেছি মাটির কাছাকাছি। আমার অন্য কোনো দায় ছিল না। অন্য কোনো মোহ ছিল না। আমার সমস্ত টান এবং মমত্ববোধজুড়ে মানিকগঞ্জের মাটি ও মানুষ। আমি তাদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমগ্র জীবন আমি মানিকগঞ্জেই থাকবো। আমার চলে যাওয়ার সময়-স্থান-প্রেক্ষাপট নিয়ে আমার অগ্রিম কোনো ধারণা নেই। তবুও আমি সবাইকে জানিয়ে রেখেছি, আমার কবরটা যেন এই মাটিতেই হয়। আমার আয়ু ফুরোবার পর এ মানিকগঞ্জের মাটিতে শেষ ঘুম ঘুমাতে চাই। মুন্নু সিটির ভেতরে জামে মসজিদের প্রাত্যহিক আজান যেন আমি শুনতে পাই। এ মাটি ছেড়ে আমি অন্য কোথাও যেতে চাই না। মানিকগঞ্জের প্রতি আমার আবেগের প্রাবল্য এখানেই।’ বইয়ে লেখা হারুণার রশিদ খান মুন্নুর শেষ চাওয়াটাও পূরণ হয়েছে। ঘুমিয়ে আছেন তার হাতে গড়া মুন্নু সিটিতে স্থাপিত দৃষ্টিনন্দন মসজিদের পাশেই।
৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে যা থাকছে:
প্রয়াত শিল্পপতি হারুণার রশিদ খান মুন্নুর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মুন্নু গ্রুপের সকল প্রতিষ্ঠান পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করবে। সকালে সূর্য উঠার পরপরই মুন্নু সিটিতে প্রতিষ্ঠিত হুরুন নাহার রশিদ জামে মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে মুন্নু গ্রুপের সবগুলো প্রতিষ্ঠান। প্রথমেই শ্রদ্ধা নিবেদন ও কবর জিয়ারত করবেন তার পরিবারের সদস্যরা। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নানান কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কোরআন তিলাওয়াত, কালোব্যাজ ধারণ, নীরবতা পালন, সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন, হামদ-নাত, রচনা প্রতিযোগিতা, তার কর্মময় জীবন সম্পর্কে আলোচনা, ইসলামিক গান, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও পুরস্কার বিতরণ। মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল (অব.) জহিরুল ইসলাম এই কর্মসূচির কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া মুন্নু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ মুন্নু গ্রুপের সকল প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক পৃথক ভাবে মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ ছাড়া মুন্নু সিটিতে স্থাপিত হুরুন নাহার রশিদ জামে মসজিদে কোনআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।












