• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

আন্তর্জাতিক

কারখানার শ্রমিক থেকে অ্যাপল–টেসলার সরবরাহকারী এক চীনা নারী উদ্যোক্তার গল্প

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৩৩
আপডেট: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৩৩

কারখানার শ্রমিক থেকে অ্যাপল–টেসলার সরবরাহকারী এক চীনা নারী উদ্যোক্তার গল্প
 

শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত

মাত্র ১৫ বছর বয়সে কারখানায় কাজ শুরু করেছিলেন চীনের উদ্যোক্তা ঝোউ ছুনফেই। তিন দশকের বেশি সময় পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত লেন্স টেকনোলজি এখন অ্যাপল ও টেসলার মতো বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে। তাঁর এই উত্থান অনেকটা রূপকথার মতোই।

বিষয়টি হলো, চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক দৃশ্য বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে টিম কুক ও ইলন মাস্কের মাঝখানে বসেছিলেন ঝোউ ছুনফেই। ছবিটি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রতীক নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে আরও বড় এক বাস্তবতা সামনে এসেছে। সেটা হলো, চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বৈশ্বিক প্রযুক্তিব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

টিম কুক ও ইলন মাস্কের মাঝখানে বসা ঝোউ প্রচারের জোরে পরিচিতি পাওয়া উদ্যোক্তা নন। হুনান প্রদেশের গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের এই নারী কিশোর বয়সে কারখানায় কাজ শুরু করেন। পরবর্তীকালে ছোট কাচে নকশা ছাপার কারখানা থেকে গড়ে তোলেন লেন্স টেকনোলজি। বর্তমানে বিশ্বে যেসব কোম্পানি সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ তৈরি করে, তার মধ্যে এটি একটি।

লেন্স টেকনোলজির উত্থানের সঙ্গে আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গল্প জড়িয়ে আছে। অ্যাপলের সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকের যাওয়ার মাধ্যমে স্মার্টফোনের যুগে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বৈদ্যুতিক গাড়ি, এআই হার্ডওয়্যার, স্মার্ট গাড়ির ককপিট, রোবট ও মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ তৈরিতেও নাম লিখিয়েছে তারা।

যেভাবে শুরু

স্মার্টফোনের যুগ শুরু হওয়ার অনেক আগেই শেনঝেনের দ্রুতবর্ধনশীল শিল্পাঞ্চলে কাচ তৈরির কাজ শিখছিলেন ঝোউ ছুনফেই। হুনানে দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা ঝোউ মাত্র ১৫ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দক্ষিণ চীনে চলে যান। সেখানে এক কারখানায় কাজ নেন।

চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় লাখ লাখ অভ্যন্তরীণ শ্রমিকের মতো ঝোউকেও দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়েছে। ছিল কঠোর নিয়মকানুন ও তীব্র প্রতিযোগিতা। তবে অন্যদের থেকে একটি জায়গায় আলাদা ছিলেন তিনি। উৎপাদনপ্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়, সেটা তিনি মন দিয়ে শিখতেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে নিজের ব্যবসা শুরু করেন।

শুরুতে ঝোউ ছুনফেইয়ের কারখানায় ঘড়ির কাচে নকশা ও লেখা ছাপার কাজ হতো। কারখানাটি ছিল ছোট। ব্যবসাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ঝোউ তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, ইলেকট্রনিক পণ্য যত ছোট ও হালকা হবে, সেগুলো তৈরিতে সূক্ষ্ম ও উন্নত প্রযুক্তির গুরুত্ব তত বাড়বে।

সে ধারণা থেকেই ধীরে ধীরে ঝোউর প্রতিষ্ঠান বড় হতে থাকে। একসময় বড় ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতাদের জন্য প্রয়োজনীয়—এমন কাচ ও টাচস্ক্রিন-সংশ্লিষ্ট উপাদান তৈরি শুরু করে লেন্স।

অ্যাপলের সরবরাহকারী

২০১৫ সালে লেন্স টেকনোলজি শেনঝেনের চাইনেক্সট বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর ঝোউ চীনের অন্যতম ধনী আত্মপ্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন।

ঝোউর উত্থানের গল্প আলাদা করে মানুষের নজর কাড়ে। কেননা, তাঁর সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নয়। অর্থ, আবাসন বা ইন্টারনেট ব্যবসার ওপর ভর করেও তিনি বড় হননি। উৎপাদন খাতের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে নতুন ব্যবসা গড়ে তোলেন তিনি।

চীনের রাষ্ট্রীয় ভোজে টিম কুক ও ইলন মাস্কের মাঝখানে যে তিনি বসলেন, সেখানেই তাঁর গুরুত্ব। কূটনীতিতে কে কার সঙ্গে বসলেন, সেটাও অনেক সময় বার্তা দেয়। ঝোউর অবস্থান যেন বলে দিচ্ছিল, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থায় লেন্স টেকনোলজির গুরুত্ব এখন কোথায়।

অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানের এমন সরবরাহকারী দরকার, যারা মান বজায় রেখে নিখুঁত যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারে। টেসলারও স্মার্ট গাড়ি ও ভবিষ্যতের রোবট তৈরির জন্য উন্নত উপকরণ ও কাঠামোগত যন্ত্রাংশ প্রয়োজন। লেন্স এখন এ দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত।

এআইয়ের যুগে নতুন লক্ষ্য

স্মার্টফোনের বাইরেও পা দিয়েছে লেন্স টেকনোলজি। সে কারণে এখন এআই হার্ডওয়্যারের দৌড়ে তারা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্ট গাড়ি, এআই চশমা, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, গাড়ির ককপিট ও বিভিন্ন উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরি করছে তারা।

এ ছাড়া মহাকাশপ্রযুক্তি ও মানুষের মতো দেখতে রোবট তৈরিতেও লেন্সের নাম জড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।

ইলন মাস্কের জন্য এমন অংশীদার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তিপণ্য দ্রুত ও বড় পরিসরে তৈরি করতে পারে, তাদের কদর আছে। বিশেষ করে টেসলা, অপটিমাস রোবট ও স্পেসএক্সের মতো প্রকল্পে এমন সরবরাহকারী দরকার।

কাচ ও ধাতু প্রক্রিয়াজাত করা, বিভিন্ন উপাদান জোড়া লাগানো ও নিখুঁত কাঠামোগত যন্ত্রাংশ তৈরিতে লেন্সের অভিজ্ঞতা মাস্কের এসব প্রকল্পের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মিলে যায়। লেন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উত্তর আমেরিকার তাদের বড় গ্রাহক আছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ওই গ্রাহক হলো টেসলা।

শুধু সস্তা উৎপাদনের দেশ নয়

অনেক বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে চীন ছিল কম খরচে পণ্য তৈরির অংশীদার। এখন সে ধারণা বদলাচ্ছে।

লেন্স টেকনোলজি নিজেকে এআই হার্ডওয়্যারের যুগের জন্য এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে এক জায়গা থেকেই বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ তৈরি হবে।

এর কারণও পরিষ্কার। প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপ শুধু পণ্য জোড়া লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উন্নত স্মার্টফোন, গাড়ি, চশমা বা রোবট তৈরিতে পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়া একসঙ্গে সামলাতে পারে—এমন দক্ষ শিল্পব্যবস্থা দরকার হবে।

লেন্স সে পথেই এগোচ্ছে। স্মার্টফোন ও কম্পিউটার এখনো তাদের আয়ের বড় উৎস। পাশাপাশি স্মার্ট গাড়ি, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, এআই চশমা ও মহাকাশ-সংশ্লিষ্ট পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

অতি পাতলা সৌর প্যানেলের কাচ ও মহাকাশে ব্যবহার উপযোগী নমনীয় কাচ নিয়েও কাজ করছে তারা। অর্থাৎ শুধু ভোক্তা ইলেকট্রনিকস নয়, ভবিষ্যতে অধিক মূল্য সংযোজনকারী শিল্পেও জায়গা করে নিতে চাইছে লেন্স।

চীনের শিল্পনীতিতেও এ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শুধু বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি নয়, বরং উন্নত প্রকৌশল, এআই, রোবট, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশপ্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো। লেন্স টেকনোলজির পরিবর্তনও সেই বৃহত্তর প্রবণতার উদাহরণ।

চ্যালেঞ্জ কম নয়

এ পরিবর্তনের পথ অবশ্য বন্ধুর। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে লেন্সের আয় কমেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিট লোকসানের মুখে পড়েছে। এর পেছনে স্মার্টফোনের চাহিদা কমে যাওয়া ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের চাপ ছিল বড় কারণ।

এতে বোঝা যায়, উৎপাদন খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের সমস্যায় আছে। স্মার্টফোনের বাজার এখন অনেকটাই পরিণত। আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না। ফলে ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা বৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে হচ্ছে।

এআই হার্ডওয়্যার ও স্মার্ট গাড়ি হতে পারে সেই নতুন সম্ভাবনার জায়গা। তবে এ দুই খাতেই প্রতিযোগিতা তীব্র—বিনিয়োগের প্রয়োজনও অনেক বেশি।

ঝোউর গল্প কেন গুরুত্বপূর্ণ

ঝোউ ছুনফেইকে নিয়ে আগ্রহ শুধু তাঁর সম্পদ কিংবা রাষ্ট্রীয় ভোজে টিম কুক ও ইলন মাস্কের মাঝখানে বসার কারণে নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে সাফল্য ও প্রভাব কোথা থেকে আসে, তাঁর গল্প সেই প্রচলিত ধারণাও কিছুটা বদলে দেয়।

গত কয়েক বছরে প্রযুক্তির গল্পে সফটওয়্যার উদ্যোক্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা এআইয়ের অ্যালগরিদম বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বাস্তব উৎপাদনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলোর জন্য কাচ, সেন্সর, বিভিন্ন কাঠামোগত উপাদান ও সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ কাউকে না কাউকে তৈরি করতে হয়।

চীনের শিল্পায়নের সময় শেনঝেনের কারখানায় লাখ লাখ মানুষ কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে খুব কম মানুষই বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছেন। ঝোউ তাঁদের একজন।

ঝোউ সফল হয়েছেন। কেননা, স্মার্টফোনের বাজার বিকশিত হওয়ার আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিপণ্যে যন্ত্রাংশের মান অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রযুক্তিপণ্য যত উন্নত হবে, সেগুলো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়াও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—ঝোউ ছুনফেইয়ের সাফল্য মূলত সেই উপলব্ধির গল্প।

আ/আ

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম