• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

অর্থ-বাণিজ্য

সরকারি দপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এক লাখ নিয়োগ আটকে গেল, কী বলছে অর্থ বিভাগ

প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৭
আপডেট: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৭

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব ঝুলে গেছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা সংশোধনের কারণে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এসব পদে নিয়োগ দিতে পারছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মী নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এত দিন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হতো আউটসোর্সিং বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর সরাসরি লোক নিয়োগ করতে পারবে। এ ছাড়া কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ চাইলে অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আইআইএফসির মাধ্যমে লোক নিয়োগ দিতে পারবে। আরও পড়ুন প্রশাসনিক ভবনে তালা দিলেন চাকরিহারা আউটসোর্সিং কর্মীরা ০১ জুলাই ২০২৬ প্রশাসনিক ভবনে তালা দিলেন চাকরিহারা আউটসোর্সিং কর্মীরা সমস্যার সূত্রপাত ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধনকে কেন্দ্র করে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ নীতিমালা জারি হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর। সংশোধিত নীতিমালায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা নেওয়ার বিধান নেই। মন্ত্রণালয়গুলো ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারি ক্রয় বিধিমালা বা পিপিআরে কিছু বলা নেই। ফলে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। নীতিমালা অসম্পূর্ণ ও এটিতে ত্রুটি দেখছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লোক নেওয়ার জন্য যেসব দরপত্র চলমান রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কী হবে—তা এ নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আরও পড়ুন আউটসোর্সিং-কর্মীদের কোন এলাকায় কত বেতন, জানাল অর্থ মন্ত্রণালয় ১৭ এপ্রিল ২০২৫ আউটসোর্সিং-কর্মীদের কোন এলাকায় কত বেতন, জানাল অর্থ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব আসিব আহসান প্রথম আলোকে বলেন, চলমান দরপত্রের বিষয়ে কী করণীয়, তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে তাদের বিভাগের কয়েক হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের কথা রয়েছে। তবে নীতিমালা স্পষ্ট না থাকায় সেসব নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। সংশোধিত নীতিমালা জারির পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির লোকজন নিয়োগ দিতে পারছে না। আবার সরাসরি নিজেরাও সরাসরি নিয়োগ দিতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগ সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথোরিটিকে (বিপিপিএ) চিঠি দিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগ থেকে এ চিঠি দেওয়া হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ আটকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নীতিমালার কারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব আটকে গেছে। এসব পদের মধ্যে রয়েছে হাসপাতালের সুইপার, ল্যাব সহকারী, ট্রলিম্যানসহ বিভিন্ন ধরনের সেবাকর্মী। এ ছাড়া সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য সেবামূলক কাজের জন্য কর্মী নিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের কাজে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নতুন নীতিমালার কারণে এসব নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। রেলপথ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব ঝুলে রয়েছে। অর্থ বিভাগের প্রস্তাব কী অর্থ বিভাগ গত ২১ সেপ্টেম্বর দেওয়া চিঠিতে বলেছে, সরকারি কাজে গতিশীলতা আনা, স্বল্পতম সময়ে সেবা পাওয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সাশ্রয় এবং মানসম্মত সেবা কেনার লক্ষ্যে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, সরকারি ক্রয় বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এ আউটসোর্সিংকে ভৌত সেবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা নেওয়ার বিষয়টি আইন ও বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত নেই। এ কারণে সংশোধিত নীতিমালা বাস্তবায়নে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার বিষয়টি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিপিপিএকে অনুরোধ করেছে অর্থ বিভাগ। বিপিপিএর পর্যবেক্ষণ অর্থ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিপিপিএ সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার প্রস্তাব এবং নীতিমালায় অর্থ বিভাগের আনা সংশোধনীগুলো পর্যালোচনা করেছে। ১৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে সংস্থাটি বলেছে, আউটসোর্সিং ব্যবস্থা চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সেবাকর্মীদের সরাসরি চুক্তিগত সম্পর্ক এড়ানো। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব কর্মীকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি থেকে যে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, তা এড়ানোও ছিল এর উদ্দেশ্য। বর্তমান ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ চুক্তি করে। সেবাকর্মীরা ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে সরকারি দপ্তরে সেবা দেন। কিন্তু সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তির সুযোগ তৈরি হলে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো বদলে যাবে। এতে আগের জটিলতাগুলো আবার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিপিপিএ আরও বলেছে, সরকারি ক্রয়ের আইনি কাঠামোর আওতায় সেবা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত চুক্তির ধরন অনুসরণ ও বাস্তবায়নে যে দক্ষতা প্রয়োজন, ব্যক্তি পর্যায়ের সেবাকর্মীদের অনেকের তা না–ও থাকতে পারে। ফলে সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বন্ধ হলে বিদ্যমান সেবা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকারি ক্রয়ে বৈষম্যহীন অংশগ্রহণের প্রশ্নও উঠতে পারে। কোনো সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বন্ধ করার বিষয়টি সরকারি ক্রয়ের আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে বিপিপিএ। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে ভৌত সেবা কেনার ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ৯৯(১)(ব) অনুযায়ী নিজস্ব জনবল দিয়ে সেবা দেওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই দেশব্যাপী আউটসোর্সিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি। বিপিপিএর চিঠিতে বলা হয়, সেবাকর্মী নির্বাচনের পদ্ধতি, চুক্তিগত দায় এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। এ জন্য অর্থ বিভাগ, বিপিপিএ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। আউটসোর্সিং নিয়ে দুই মত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগে পক্ষে বিপক্ষে বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাঁরা অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের অভিযোগ, সরকারি দপ্তরে নিয়োগের আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়। আবার চাকরি হওয়ার পর প্রতি মাসে বেতন থেকে একটি অংশ কেটে রাখে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এটিকে দাসপ্রথা উল্লেখ করে সরকার যেন সরাসরি নিয়োগ দেয়, সে দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দাবি, বেসরকারিভাবে নিয়োগ হলে নিয়োগকৃত জনবলকে প্রশিক্ষিত করে তোলা হয়। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। সরকারিভাবে নিয়োগ হলে তাঁদের প্রশিক্ষিত করে তোলার মতো সক্ষমতা সরকারের নেই। আবার কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন। বাংলাদেশ আউটসোর্সিং ম্যানপাওয়ার প্রোভাইডার সোসাইটির সভাপতি আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫ লাখের বেশি জনবল সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের আগে তাঁদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের নজরদারি ও জবাবদিহি সবই করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এখন সরকার নিজেরাই চাইছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ দিতে। এতে সরকারি কাজে বিশৃঙ্খলা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়োগ নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিও বাড়বে। তা ছাড়া বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও নেই। আউটসোর্সিং নিয়োগ কেন অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০০৮ সালে প্রথম আউটসোর্সিং নীতিমালা করা হয়। তখন সরকারের যুক্তি ছিল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও পেনশনের পেছনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ খরচ কমাতে হবে। বিভিন্ন ভাতা ও পেনশন খরচ কমাতে ২০০৯ সাল থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরি সরকারিভাবে নিয়োগ না দিয়ে অস্থায়ী পদে নিয়োগ শুরু হয়। নীতিমালায় বলা হয়, আউটসোর্সিংয়ের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের চুক্তি হবে না। স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হবে। কোনো ব্যক্তির নামে নিয়োগপত্র ইস্যু করা যাবে না। এরপর ২০১৮ ও ২০২৫ সালে আরও দুবার এ নীতিমালা সংশোধন হয়। প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
 

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব ঝুলে গেছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা সংশোধনের কারণে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এসব পদে নিয়োগ দিতে পারছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মী নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এত দিন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হতো আউটসোর্সিং বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর সরাসরি লোক নিয়োগ করতে পারবে। এ ছাড়া কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ চাইলে অর্থ বিভাগের অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আইআইএফসির মাধ্যমে লোক নিয়োগ দিতে পারবে।

সমস্যার সূত্রপাত ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধনকে কেন্দ্র করে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ নীতিমালা জারি হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর। সংশোধিত নীতিমালায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা নেওয়ার বিধান নেই। মন্ত্রণালয়গুলো ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারি ক্রয় বিধিমালা বা পিপিআরে কিছু বলা নেই। ফলে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে।

নীতিমালা অসম্পূর্ণ ও এটিতে ত্রুটি দেখছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লোক নেওয়ার জন্য যেসব দরপত্র চলমান রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কী হবে—তা এ নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব আসিব আহসান প্রথম আলোকে বলেন, চলমান দরপত্রের বিষয়ে কী করণীয়, তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে তাদের বিভাগের কয়েক হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের কথা রয়েছে। তবে নীতিমালা স্পষ্ট না থাকায় সেসব নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

সংশোধিত নীতিমালা জারির পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির লোকজন নিয়োগ দিতে পারছে না। আবার সরাসরি নিজেরাও সরাসরি নিয়োগ দিতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগ সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথোরিটিকে (বিপিপিএ) চিঠি দিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগ থেকে এ চিঠি দেওয়া হয়।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ আটকে

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নীতিমালার কারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব আটকে গেছে। এসব পদের মধ্যে রয়েছে হাসপাতালের সুইপার, ল্যাব সহকারী, ট্রলিম্যানসহ বিভিন্ন ধরনের সেবাকর্মী। এ ছাড়া সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য সেবামূলক কাজের জন্য কর্মী নিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের কাজে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নতুন নীতিমালার কারণে এসব নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। রেলপথ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব ঝুলে রয়েছে।

অর্থ বিভাগের প্রস্তাব কী

অর্থ বিভাগ গত ২১ সেপ্টেম্বর দেওয়া চিঠিতে বলেছে, সরকারি কাজে গতিশীলতা আনা, স্বল্পতম সময়ে সেবা পাওয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সাশ্রয় এবং মানসম্মত সেবা কেনার লক্ষ্যে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, সরকারি ক্রয় বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এ আউটসোর্সিংকে ভৌত সেবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা নেওয়ার বিষয়টি আইন ও বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত নেই। এ কারণে সংশোধিত নীতিমালা বাস্তবায়নে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার বিষয়টি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিপিপিএকে অনুরোধ করেছে অর্থ বিভাগ।

বিপিপিএর পর্যবেক্ষণ

অর্থ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিপিপিএ সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়ার প্রস্তাব এবং নীতিমালায় অর্থ বিভাগের আনা সংশোধনীগুলো পর্যালোচনা করেছে। ১৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে সংস্থাটি বলেছে, আউটসোর্সিং ব্যবস্থা চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সেবাকর্মীদের সরাসরি চুক্তিগত সম্পর্ক এড়ানো। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব কর্মীকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি থেকে যে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, তা এড়ানোও ছিল এর উদ্দেশ্য।

বর্তমান ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ চুক্তি করে। সেবাকর্মীরা ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে সরকারি দপ্তরে সেবা দেন। কিন্তু সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তির সুযোগ তৈরি হলে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো বদলে যাবে। এতে আগের জটিলতাগুলো আবার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিপিএ আরও বলেছে, সরকারি ক্রয়ের আইনি কাঠামোর আওতায় সেবা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত চুক্তির ধরন অনুসরণ ও বাস্তবায়নে যে দক্ষতা প্রয়োজন, ব্যক্তি পর্যায়ের সেবাকর্মীদের অনেকের তা না–ও থাকতে পারে। ফলে সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

একই সঙ্গে বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বন্ধ হলে বিদ্যমান সেবা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকারি ক্রয়ে বৈষম্যহীন অংশগ্রহণের প্রশ্নও উঠতে পারে। কোনো সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বন্ধ করার বিষয়টি সরকারি ক্রয়ের আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে বিপিপিএ।

এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে ভৌত সেবা কেনার ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ৯৯(১)(ব) অনুযায়ী নিজস্ব জনবল দিয়ে সেবা দেওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই দেশব্যাপী আউটসোর্সিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।

বিপিপিএর চিঠিতে বলা হয়, সেবাকর্মী নির্বাচনের পদ্ধতি, চুক্তিগত দায় এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। এ জন্য অর্থ বিভাগ, বিপিপিএ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।

আউটসোর্সিং নিয়ে দুই মত

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগে পক্ষে বিপক্ষে বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাঁরা অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের অভিযোগ, সরকারি দপ্তরে নিয়োগের আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়। আবার চাকরি হওয়ার পর প্রতি মাসে বেতন থেকে একটি অংশ কেটে রাখে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এটিকে দাসপ্রথা উল্লেখ করে সরকার যেন সরাসরি নিয়োগ দেয়, সে দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।

অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দাবি, বেসরকারিভাবে নিয়োগ হলে নিয়োগকৃত জনবলকে প্রশিক্ষিত করে তোলা হয়। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। সরকারিভাবে নিয়োগ হলে তাঁদের প্রশিক্ষিত করে তোলার মতো সক্ষমতা সরকারের নেই। আবার কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন।

বাংলাদেশ আউটসোর্সিং ম্যানপাওয়ার প্রোভাইডার সোসাইটির সভাপতি আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫ লাখের বেশি জনবল সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের আগে তাঁদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের নজরদারি ও জবাবদিহি সবই করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এখন সরকার নিজেরাই চাইছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ দিতে। এতে সরকারি কাজে বিশৃঙ্খলা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়োগ নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিও বাড়বে। তা ছাড়া বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও নেই।

আউটসোর্সিং নিয়োগ কেন

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০০৮ সালে প্রথম আউটসোর্সিং নীতিমালা করা হয়। তখন সরকারের যুক্তি ছিল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও পেনশনের পেছনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ খরচ কমাতে হবে। বিভিন্ন ভাতা ও পেনশন খরচ কমাতে ২০০৯ সাল থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরি সরকারিভাবে নিয়োগ না দিয়ে অস্থায়ী পদে নিয়োগ শুরু হয়। নীতিমালায় বলা হয়, আউটসোর্সিংয়ের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের চুক্তি হবে না। স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হবে। কোনো ব্যক্তির নামে নিয়োগপত্র ইস্যু করা যাবে না। এরপর ২০১৮ ও ২০২৫ সালে আরও দুবার এ নীতিমালা সংশোধন হয়।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম