• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

সারাদেশ

‘আমার সোনার টুকরো ছেলেটিকে কেড়ে নিল, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব’

প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ৩:১৬
আপডেট: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ৩:১৬

‘আমার সোনার টুকরো ছেলেটিকে কেড়ে নিল, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব’
 

মরদেহ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। বাড়িতে চলছে সেই প্রস্তুতি। এর মধ্যেই ঘরে চুপচাপ বসে কাঁদছেন অর্জুন বণিক। ছেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই হু হু করে কেঁদে ওঠেন। জানালেন, ২৬ বছর বয়সী সন্তান অরূপ বণিককে এভাবে হারাতে হবে কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি।

অর্জুন বণিক চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদিফকিরহাট এলাকার বাসিন্দা। এক সপ্তাহ জ্বরে ভোগার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মৃত্যু হয় তাঁর ছেলে অরূপ বণিকের। পরিবারের দাবি, ডেঙ্গুতে অরূপের মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকা থেকে গতকাল বিকেলে বাড়িতে ফেরার এক ঘণ্টা পর মৃত্যু হয় অরূপের। রাত ১১টার দিকে পারিবারিক শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন অরূপ। ভালোবাসতেন অন্যদের মধ্যেও বই ছড়িয়ে দিতে। বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে তাই করোনাকালে গড়ে তুলেছিলেন অনলাইনে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম ‘বইপাড়া ডটকম’। এ ছাড়া পরে ঢাকার বাংলাবাজারেও বইয়ের একটি দোকান দিয়েছিলেন তিনি। পুরান ঢাকার একটি মেসে থেকে সেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

অরূপের বাবা অর্জুন বণিক জানান, দুই সপ্তাহ আগে তাঁর পরিবারের সবাই ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন। তাই পরিবারের সদস্যদের সেবা-শুশ্রূষা করতে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন অরূপ। তাঁরা একটু সুস্থ হতেই অরূপ ঢাকা ফিরে যান। ঢাকায় ফেরার পর অরূপেরও জ্বর আসে। শরীর ব্যথাসহ ডেঙ্গুর সব লক্ষণ ছিল তাঁর।

কিশোর বয়স থেকেই এলাকায় নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন অরূপ। মানুষের দুঃসময়ে পাশে থাকতে ভালোবাসতেন তিনি। বই পাঠের মাধ্যমে মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, এমন ভাবনা থেকেই তিনি বই ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।

-মো. মোস্তফা, অরূপের বন্ধু।
অর্জুন বণিক বলেন, ‘তাকে বারবার ঢাকা থেকে বাড়ি আসার তাগাদা দিয়েছি। কিন্তু ছেলে আমার কথা শোনেনি। আর কুলিয়ে উঠতে না পেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি এসেছিল। বাস থেকে নামার পর জড়িয়ে ধরে কোনোমতে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসি। ঘরে আসার এক ঘণ্টা মধ্যেই তার অবস্থার আরও অবনতি হয়। আমরা স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই তাকে। সেখানে চিকিৎসক জানায়, আমার ছেলে আর নেই।’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে আমাদের শুধু একনজর দেখতেই অরূপ বাড়িতে এসেছিল। আমার এমন সোনার টুকরো ছেলেটিকে ডেঙ্গু কেড়ে নিল, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব।’

অর্জুন বণিকের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে অরূপ সবার ছোট। গতকাল রাতে তাঁদের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, অরূপের মরদেহের পাশে বসে কাঁদছেন তাঁর দুই বোন। অরূপের বন্ধুরাও ছুটে এসেছেন সেখানে। কেউ হাউমাউ করে কাঁদছেন, কেউ অরূপের স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত।

বন্ধু ও স্বজনেরা জানান, সরকারহাট এনআর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মিরসরাইয়ের প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন অরূপ। পরে ফেনীর জয়নাল হাজারী কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন।

২০২০ সালে করোনাকালে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ায় দুই বন্ধু আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও অনিক বণিককে নিয়ে অনলাইনে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম বইপাড়া ডটকম চালু করেন অরূপ। উদ্যোগটি শুরুর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলার পাঠকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পান।

দুই বছর পর ফেনী শহর ছেড়ে কিছুদিন চট্টগ্রাম নগরে থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এগিয়ে নেন অরূপ। এ সময় তাঁর দুই বন্ধু বই বিক্রির কাজ থেকে সরে গেলেও তিনি উদ্যোগটি চালিয়ে যান। অনলাইনে বই বিক্রির পাশাপাশি ২০২৪ সালে ঢাকার বাংলাবাজারে একটি দোকান খোলেন। পুরান ঢাকার একটি মেসে থেকে দোকানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের বই বিক্রি করতেন তিনি।

অরূপের ঘরে কথা হয় তাঁর বন্ধু ও একই এলাকার বাসিন্দা মো. মোস্তফার সঙ্গে। তিনি বলেন, কিশোর বয়স থেকেই এলাকায় নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন অরূপ। মানুষের দুঃসময়ে পাশে থাকতে ভালোবাসতেন তিনি। বই পাঠের মাধ্যমে মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, এমন ভাবনা থেকেই তিনি বই ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।

অরূপের মৃত্যুর খবর পেয়ে গতকাল রাতে ফেনী শহর থেকে তাঁর বাড়িতে আসেন বন্ধু ও বইপাড়া ডটকমের সহ–উদ্যোক্তা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। শ্মশানে শেষকৃত্যের আগে তিনি বন্ধুর মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, করোনাকালে তিন বন্ধু মিলে বইপাড়া ডটকম চালু করেছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে উদ্যোগটি সাড়া ফেলেছিল। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি নানা ধরনের বই বিক্রি করতেন তাঁরা। আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অরূপ বই বিক্রির কাজ চালিয়ে গেছেন। এটিকেই জীবিকা হিসেবে নিয়েছিলেন অরূপ। অরূপের এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মানতে পারছেন না।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম