• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

সম্পাদকীয়

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:০৮
আপডেট: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:০৮

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

ড. একেএম আহসান উল্লাহ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে শুধু একটি ভাষণ বা কয়েকটি সৌজন্য সাক্ষাতের হিসাবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। সফরে তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন, রোহিঙ্গা সংকটে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ চেয়েছেন এবং বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছেন। তবে কূটনীতির অর্জন বিচার করতে দুটি প্রশ্ন আলাদা রাখা প্রয়োজন : বাংলাদেশ কী বক্তব্য দিয়েছে, আর সেই বক্তব্যের ফলে কী বাস্তব সিদ্ধান্ত হয়েছে? প্রথম প্রশ্নে সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ; দ্বিতীয়টির উত্তর মিলবে আগামী মাসগুলোতে।

২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং সবার জন্য সমান সুযোগের কথা বলেন। সরকার রাষ্ট্র মেরামতে ‘পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন’-এ তিন ধাপের কৌশল অনুসরণ করছে বলেও জানান।

একটি নতুন সরকারের জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা শুধু বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখেন না; নীতির ধারাবাহিকতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও বিবেচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সেই আলোচনার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।

ভাষণের আন্তর্জাতিক অংশে তিনি সংঘাত নিরসনে আলোচনা ও কূটনীতির ওপর জোর দেন। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন। এগুলো বাংলাদেশের পরিচিত অবস্থান হলেও বর্তমান অস্থির বিশ্বে পুনর্ব্যক্ত করার মূল্য আছে।

বিশেষ করে অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নটি বাংলাদেশকে আরও ধারাবাহিকভাবে তুলতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকের অবদান স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; নিয়োগে প্রতারণা, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন এবং প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিয়েও গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন।

সফরের সবচেয়ে সুস্পষ্ট কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল রোহিঙ্গা সংকটকে সাধারণ ভাষণের পাশাপাশি একটি পৃথক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় স্থান দেওয়া। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে ২৩ সেপ্টেম্বরের ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ প্রস্তাব করেন : নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা; মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গা এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা; ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি; এবং মানবপাচার, মাদক অর্থনীতি ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা। সাধারণ পরিষদের ভাষণেও তিনি বলেন, সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং টেকসই সমাধানের শর্তও সেখানেই তৈরি করতে হবে।

এ প্রস্তাবের শক্তি হলো, এতে প্রত্যাবর্তনকে কেবল বাংলাদেশ থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার বিষয় হিসাবে দেখা হয়নি। নিরাপত্তা, অধিকার, মানবিক সহায়তা এবং জবাবদিহিকে একই আলোচনায় আনা হয়েছে। কিন্তু পাঁচ দফা ঘোষণাই রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিস্থিতি তৈরি করে না। মিয়ানমারে কারা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অধিকার কীভাবে স্বীকৃতি পাবে এবং আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো অগ্রগতি কীভাবে যাচাই করবে-এসবের উত্তর এখনো দরকার। সফরটি সফল হতে হলে বাংলাদেশকে প্রস্তাবগুলোর জন্য সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ এবং নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলো সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তি এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্য, পেশাজীবীদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনায় আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত অংশীদারত্ব ও সংলাপের বিষয়ও উঠেছে। ভুটান, মালদ্বীপ, হাইতি ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক আঞ্চলিক এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে। কুয়েতের যুবরাজের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। এসব সাক্ষাৎ একেকটি দরজা খুলতে পারে; কোন দরজা দিয়ে বাস্তব সহযোগিতা এগোবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনার ওপর।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক এবং মিয়ানমারবিষয়ক তার বিশেষ দূত ও শরণার্থী সংস্থার নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা রোহিঙ্গা প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে কথা হয়েছে। অন্যদিকে নিউইয়র্কে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে। এখানে সতর্ক ভাষাই যথার্থ : আলোচনা হয়েছে মানেই অর্থায়ন, বিনিয়োগ বা নীতিগত সমর্থন চূড়ান্ত হয়েছে, এমন নয়। অর্জন হলো সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং বাংলাদেশের প্রস্তাব তাদের সামনে রাখা।

জলবায়ু বিষয়েও সফরটির একটি স্পষ্ট বার্তা ছিল। প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় গভীরতর নিঃসরণ হ্রাস, সহজলভ্য অভিযোজন অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার চান। সাধারণ পরিষদের ভাষণে তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সহায়তা এবং নতুন প্রযুক্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অংশগ্রহণের কথাও বলেন। বিষয়গুলো পরস্পর যুক্ত : জলবায়ু ঝুঁকি সামলানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

এখন সরকারের কাজ হবে সফরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পরবর্তী ধাপ প্রকাশ করা। কোন দেশের সঙ্গে কোন বিষয়ে আলোচনা এগোবে, কোন মন্ত্রণালয় দায়িত্ব নেবে এবং কবে অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে-এ তথ্য জানা গেলে সফরের মূল্যায়নও সহজ হবে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে নিয়মিত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, শ্রম অভিবাসনে অধিকারভিত্তিক চুক্তি, জলবায়ু অর্থায়নে নির্দিষ্ট প্রস্তাব এবং বিনিয়োগে বাস্তব বাধা দূর করার পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশে সুশাসন ও নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে; বিদেশে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত দেশের কাজ দিয়েই গড়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাধারণ পরিষদ ভাষণ বাংলাদেশকে তার অগ্রাধিকার নিজের ভাষায় বলার সুযোগ দিয়েছে। একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সেই বক্তব্যকে সহযোগিতার আলোচনায় নিয়ে গেছে। এটাই সফরের তাৎক্ষণিক অর্জন। এর দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য নির্ধারিত হবে তখন, যখন ঘোষিত রূপরেখা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায়, আলোচিত অংশীদারত্ব কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে, আর জলবায়ু দাবিগুলো বাস্তব সহায়তায় রূপ নেবে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কথা শোনা গেছে; এখন সেই কথার পক্ষে ধারাবাহিক কূটনৈতিক কাজ দেখানোর সময়।

ড. একেএম আহসান উল্লাহ : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

[email protected]


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com