• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

জাতীয়

শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মো.মঞ্জুর হোসেন ঈসা

প্রকাশ: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:১৯
আপডেট: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:১৯

শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মো.মঞ্জুর হোসেন ঈসা

নিজস্ব প্রতিনিধি
ছবি : প্রতিনিধি
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। মানুষ গড়ার কারিগর, জ্ঞান ও আলোর পথপ্রদর্শক এবং একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণের অন্যতম প্রধান শক্তি শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন আজ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের শতাধিক দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
আমার জীবনের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষক আমার মা ও বাবা। তাঁদের কাছ থেকেই জীবনের প্রথম শিক্ষা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখার সুযোগ পেয়েছি। এরপর প্রাথমিক জীবনের শিক্ষক, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক এবং কলেজ জীবনের সকল শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের অবদান আমার জীবন গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাঁদের প্রত্যেককে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।
যেসব প্রিয় শিক্ষক ইতোমধ্যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন, তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ যেন তাঁদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করেন। আর যাঁরা আমাদের মাঝে জীবিত আছেন, তাঁদের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করছি।

একজন মানুষের চরিত্র, চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা অনন্য। পিতা-মাতার কাছ থেকে জীবনের ভিত্তি তৈরি হলেও সেই ভিত্তির ওপর জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তির কাঠামো নির্মাণে শিক্ষকের অবদান অপরিসীম।
আমাদের সময়ে শিক্ষক ছিলেন আদর্শের বাতিঘর। তাঁদের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, সত্য কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি।
একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তাঁর আচরণ, মূল্যবোধ ও আদর্শ শিক্ষার্থীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি একই সঙ্গে একটি মহান সামাজিক দায়িত্ব।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় যেমন নানা পরিবর্তন এসেছে, তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে শিক্ষকতার পরিবেশও। একসময় শিক্ষকের প্রধান পরিচয় ছিল তাঁর জ্ঞান, নৈতিকতা, আদর্শ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ। বর্তমানে শিক্ষাঙ্গনে নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কোথাও শিক্ষকরা ‘সাদা দল’, কোথাও ‘নীল দল’, আবার কোথাও বিভিন্ন নামে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ ব্যক্তিগত অধিকার হলেও শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব যেন শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে—এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
শিক্ষককে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞান, ন্যায়, মানবিকতা ও বিবেকের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। কারণ একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়; তাঁর যোগ্যতা, সততা, আদর্শ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা।

৫ অক্টোবরের তাৎপর্য শুধু শিক্ষককে ফুল দেওয়া কিংবা শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষকদের অধিকার, পেশাগত স্বাধীনতা, কর্মপরিবেশ, দায়িত্ব এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ইতিহাস।
১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনে UNESCO এবং International Labour Organization (ILO) শিক্ষকদের অবস্থান ও অধিকার নিয়ে ঐতিহাসিক “Recommendation concerning the Status of Teachers” গ্রহণ করে।
এই সুপারিশে শিক্ষকদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা, পারিশ্রমিক এবং দায়িত্বসহ শিক্ষকতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে শিক্ষকতার পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে UNESCO-এর ২৬তম সাধারণ সম্মেলনে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

২০২৬ সাল বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ বছর ১৯৬৬ সালের UNESCO-ILO যৌথ সুপারিশমালার ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে।
এ উপলক্ষে এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে তাঁদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।


প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—
“Teachers at the heart of education recovery: Supporting teachers, protecting the profession, and shaping our future.”
অর্থাৎ, শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকই কেন্দ্রীয় শক্তি। তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে ১০০ গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশেও নেওয়া হয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের ১০০ জন গুণী শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা বিস্তার, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রজন্ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মাননার ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রত্যেক শিক্ষককে ১ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষকতার পেশাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও মর্যাদাপূর্ণ করার একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
আগের তুলনায় এবার সম্মাননার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করার ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাঁদের বহুমাত্রিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষককে সম্মান মানেই ভবিষ্যৎকে সম্মান
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে হয় না। দক্ষ, সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির মধ্য দিয়েই একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নিশ্চিত হয়। আর সেই নাগরিক তৈরির অন্যতম কারিগর হলেন শিক্ষক।
একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, প্রশাসক কিংবা রাজনীতিবিদ—প্রত্যেকের পেছনেই কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান রয়েছে। তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে সম্মান করা নয়; বরং নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তিকে সম্মান করা।
শিক্ষকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, পেশাগত স্বাধীনতা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, সামাজিক মর্যাদা এবং যথাযথ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও শিক্ষার্থীবান্ধব মানসিকতা ধরে রাখতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা
শিক্ষাঙ্গন হোক দলীয় প্রভাবমুক্ত জ্ঞানচর্চার নিরাপদ ক্ষেত্র। শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্বাস, ন্যায় ও মানবিকতার প্রতীক। শ্রেণিকক্ষ হবে মুক্ত চিন্তা, যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সৃজনশীলতার জায়গা।
আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যেখানে শিক্ষক তাঁর মর্যাদা নিয়ে কাজ করবেন, শিক্ষার্থী নিরাপদ পরিবেশে জ্ঞান অর্জন করবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্র না হয়ে উঠবে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ছয় দশকের ইতিহাস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়—শিক্ষককে রক্ষা করতে হবে, শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতে হবে এবং তাঁদের হাত ধরেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে।
আজকের দিনে তাই আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক মা-বাবা থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ জীবনের সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
যাঁরা চলে গেছেন, তাঁদের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চির অমলিন হয়ে থাকুক। মহান আল্লাহ তাঁদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আসুন, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমরা শুধু শুভেচ্ছা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সামাজিক অঙ্গীকার করি।
শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, শিক্ষা বাঁচলে গড়ে উঠবে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
মহাসচিব
ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com