কলকাতা প্রতিনিধি
ছবি : প্রতিনিধি
দিল্লির রাজপথে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, ব্যারিকেড, আটক, যান চলাচলে বিধিনিষেধ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদ বাঁচাতে ভারতের রাজধানী শহরটিতে রেড অ্যালার্টের আবহ বিরাজ করছে। এ অবস্থায়ও সোমবার সেখানে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হয়। সেই সঙ্গে যন্তর মন্তরে কোনো বিক্ষোভ করতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ। জবাবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা মাথা নোয়াবে না; বরং পুরো ভারতকেই যন্তর মন্তর বানানো হবে।
ব্যাপক ধরপাকড় আর নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কার্যত ফুঁসছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী দলগুলো। সোমবারও এর উত্তাপ ছিল দিল্লিতে। এ অবস্থায় যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানকে নতুন ঠিকানা হিসাবে বেছে নিতে বলল দিল্লি পুলিশ।
প্রশ্ন উঠছে, যান চলাচল ও নিরাপত্তা সামলানোর যুক্তিতে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত কি আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতও কমিয়ে দেবে? সিজেপি নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি, জায়গা বদল করে আন্দোলন থামানো যাবে না। আর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পরও আমরা থামব না; শুরু হবে নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পালা। এ অবস্থায় ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ। পশ্চিমবঙ্গসহ দেশটির আরও কয়েকটি রাজ্যে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
মাথা নোয়ানোর প্রশ্নই নেই, সিজেপির হুঁশিয়ারি : গত শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন থেকে সরেননি সিজেপির অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। তাদের দাবি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে। অভিজিৎ দীপকের বার্তা, যন্তর মন্তরে আন্দোলনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হলেও আন্দোলন থামবে না, বরং পুরো দেশকেই যন্তর মন্তর করে তোলা হবে।
সৌরভ দাসের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিক অধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগের পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিকভাবেই লড়াই চলবে। আশুতোষ রাঙ্কাও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে অনড়। সোমবার সিজেপি দিল্লি পুলিশের কাছে যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের দিন ও সময় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, অনুমতি না মিললে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ফলে প্রতিবাদের স্থান বদলের সরকারি সিদ্ধান্তের পরেও সংঘাত থামার লক্ষণ নেই।
রেড অ্যালার্টের আবহ : ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের আগে থেকেই দিল্লিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, ব্যারিকেড, যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, মেট্রো পরিষেবায় বিধিনিষেধ এবং আটক করার প্রস্তুতি-সব মিলিয়ে দিল্লির একাধিক এলাকায় তৈরি হয় কড়া নিরাপত্তার পরিবেশ। বিক্ষোভের দিন বহু মানুষকে আটক করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতেও প্রতিবাদস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি অব্যাহত থাকে।
সূত্র জানায়, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে সরিয়েছে। নতুন তিনটি জায়গা হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান। প্রশাসনের যুক্তি, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ পরিচালনার জন্য বিকল্প জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের আশঙ্কা, কেন্দ্রীয় দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকার বদলে দূরের মাঠে আন্দোলন সরিয়ে দিলে তার দৃশ্যমানতা ও জনসমর্থন তুলে ধরার সুযোগ কমতে পারে। এ সিদ্ধান্ত এমন সময় এলো, যখন সিজেপি, ছাত্র সংগঠন এবং বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার করছে।
জ্ঞানেশের পর মোদি ও অমিত শাহের পালা-রাহুল : দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে সোমবার বিরোধী দলের নেতারা আবেদন করেন। একই দাবিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষ সুপ্রিমকোর্ট অভিমুখে মিছিল করেন। রাহুলের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাও ছিলেন। তারা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও তার পদত্যাগ দাবি করেন।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব। আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াটিতে নানা অনিয়ম হয়েছে।
রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে মিছিলটি তিলক মার্গ হয়ে সুপ্রিমকোর্টের দিকে যাচ্ছিল। তবে ভগবান দাস রোডে পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দেয়। ফলে মিছিলটি সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। হাজারো মানুষ তখনো ভগবান দাস রোড ও আশপাশ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। মিছিল শুরুর আগে সাংবাদিকদের রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আলাদা কোনো আন্দোলন হচ্ছে না। রাহুলের ভাষায়, ‘আলাদা কোনো প্রতিবাদ নেই। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর জন্য একটিই প্রতিবাদ চলছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী, অমিত শাহের পালা। আমরা থামব না।’ কংগ্রেসের এ নেতা অভিযোগ করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপে কাজ করছেন।
পরে রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে সাংবাদিকদের বলেন, তার হাতে এখনো সরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। একই সঙ্গে রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপের কারণে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হচ্ছে।
কলকাতার রাজপথে মমতা : কলকাতার রাজপথে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার দুপুরে রাজাবাজার থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত এ মিছিল হওয়ার কথা। এতে দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি অংশ নিতে পারেন বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের এক নেতা। এর আগে মমতা দিল্লিতে বিক্ষোভে অংশ নেন।
দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ : রোববার বিকালে সেন্ট্রাল দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলাকালে আরও শত শত বিক্ষোভকারীর মতোই নওরিনকেও আটক করা হয়। তাকে তুলে নেওয়ার পর ক্যামেরা ও জনদৃষ্টির আড়ালে যা ঘটেছিল, তা তাকে স্তম্ভিত করেছে। ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে ভোট কারচুপির অভিযোগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিন রোববার নওরিনকে আরও ১৬ বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। তাদের মধ্যে ১৫ জনই ছিলেন নারী।
‘রেভল্যুশনারি ওয়ার্কার্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’র সদস্য নওরিন ভারতের গণমাধ্যম স্ক্রলকে বলেন, ‘আমাদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে আলাদা আলাদাভাবে মারধর করা হয়।’ তিনি জানান, দিল্লি পুলিশের নারী কর্মকর্তারা ‘দিশা স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন’-এর সদস্য অরণ্যা নামের এক বিক্ষোভকারীকে নৃশংসভাবে মারধর করেন। নওরিন বলেন, ‘তারা অরণ্যাকে ভ্যানের প্রবেশপথে শুইয়ে দেন এবং একজন নারী কনস্টেবল তার গলা চেপে ধরেন। আরেকজন তাকে কনুই দিয়ে আঘাত করছিলেন।’ এরপর এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে চিকিৎসার প্রয়োজনে নিয়ে যান। নওরিন জানান, এরপর কনস্টেবলরা দলের অন্য নারীদেরও মারধর করতে থাকেন-তাদের বুকে এবং বিশেষ করে গোপনাঙ্গে আঘাত করা হয়।’
জেন-জিদের সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত-নেহা : জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন সামনে রেখে নতুন ভিডিওবার্তা দিয়েছেন ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক প্রজন্মের কাছে এমন একটা মুহূর্ত আসে যখন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়-সে কি আরাম আয়েশকে বেছে নেবে নাকি নিজের বিবেককে। আমাদের সবার সামনে ওই সেই বিশেষ মুহূর্ত আরও একবার এসেছে।’
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এ নেতা বলেন, ‘আমরা আজ যা করছি, তা আগে একবার করে ফেলেছি। ১৯৪২ সালে যখন ইংরেজ শাসকরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের গ্রেফতার করল, তখন তারা ভেবেছিল-আন্দোলন তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই আন্দোলন জীবিত ছিল। তখন নতুন প্রজন্ম ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। আজ মোদি ও শাহ সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছেন। সড়ক বন্ধ করছেন; আটক করছেন; কথা না বলতে বাধ্য করছেন। এ কারণে ১৯৪২ সালের সেই প্রজন্মের মতোই আমাদের জবাব দিতে হবে।’













