শুধু কুমিল্লা শহর বা এর আশপাশের এলাকায় নয়, জেলার প্রত্যন্ত গ্রামেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মনোহরগঞ্জ উপজেলার পোমগাঁও ও জলিপুর এবং চৌদ্দগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় কিশোরেরা দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে। সে মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
মনোহরগঞ্জে ‘পিএক্স ১০’ আর চৌদ্দগ্রামে ‘১২০৭’ নামে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়েছে। এই দুটি গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকের সন্তান সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং–বিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে জেলার ১৮টি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের সমন্বয়ে চালানো ৭ দফার অভিযানে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৬৪৭ জনকে আটক করা হয়।
চাপাতি হাতে মহড়া
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর রাতে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং নেতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কুমিল্লা নগরের তেলিকোনা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘স্ম্যাশ স্কোয়াড’ গ্যাংয়ের নেতা জিসান (১৯) এবং গ্যাংটির আরেক নেতা সাইফুল ইসলামকে (২০) গ্রেপ্তার করা হয়। চৌদ্দগ্রাম থানার অভিযানে ‘১২০৭’ গ্যাংয়ের মো. তারেক হোসেন সৈকত (১৯) ও মো. জাফর আহমদ (২৩) গ্রেপ্তার হন। তাঁরা দুজনেই গ্যাংটির নেতৃত্বে রয়েছেন।
মনোহরগঞ্জের পোমগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘পিএক্স ১০’ গ্যাংয়ের এক কিশোরকে (১৭) গ্রেপ্তার হয়। ওই কিশোরকে এই গ্যাংয়ের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। সম্প্রতি চাপাতি হাতে তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কিশোরদের এমন দলে যুক্ত হওয়ার পেছনে কারা প্রভাব রাখছে, তারা কীভাবে অস্ত্র পাচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে কারা—এসব প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
উপজেলার পোমগাঁও ও জলিপুর গ্রামের তিন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ওই কিশোরসহ অন্তত ১০ কিশোর কিছুদিন আগে পোমগাঁও ব্রিজ ও জলিপুর এলাকায় চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল ও রামদা হাতে মহড়া দেয়। পরে সেই মহড়ার ভিডিও তারা টিকটকে প্রকাশ করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, অস্ত্র হাতে ওই মহড়ার পর এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। নিজেদের প্রভাব জানান দেওয়ার জন্য কিশোরদের দলটি এভাবে মহড়া দিয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, এই কিশোরদের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক সেবন ও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
মনোহরগঞ্জের পোমগাঁওয়ের মতো চৌদ্দগ্রাম উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামেও তৎপর ‘১২০৭’ নামে একটি কিশোর গ্যাং। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই গ্যাংয়ের তারেকের বাড়ি উপজেলার নলিশ্বর এলাকায় আর জাফরের বাড়ি কোমারডোগা মধ্যমপাড়া এলাকায়। তাঁদের বিরুদ্ধে এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
জেলা পুলিশ বলছে, ‘১২০৭’ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও সক্রিয় রয়েছে। গত বছর এই গ্যাংয়ের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং–বিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। কয়েক দফার অভিযানে নগরের পরিচিত গ্যাংগুলোর নেতাদের পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার গ্যাংয়ের সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কিশোরদের এমন দলে যুক্ত হওয়ার পেছনে কারা প্রভাব রাখছে, তারা কীভাবে অস্ত্র পাচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে কারা—এসব প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংগুলোকে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না বলে জানান কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান। ৫ অক্টোবর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কুমিল্লা নগরের বাইরে প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে পড়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আর শহর বা গ্রামাঞ্চল দেখছি না। প্রতিটি থানা এলাকায় নিয়মিত কিশোর গ্যাং–বিরোধী অভিযান চালানো হবে।’
রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাং–বিরোধী যে অভিযান পুলিশ–প্রশাসন শুরু করেছে, তা অব্যাহত রাখা উচিত। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সচেতনতা দরকার।
শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান, সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক, কুমিল্লা শাখা
কুমিল্লা নগরের আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপের’ (আর স্কোয়াড) প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে ২ অক্টোবর রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনের অভিযানে আরও গ্রেপ্তার হন ‘ক্রাইম সেটআপ’ গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতা মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ এবং রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকার’। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট ‘ঈগল গ্রুপের’ শাহাদাত হোসেনকে (১৭) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার পর রতন গ্রুপ আলোচনায় আসে।
সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে কোটবাড়িকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং ‘কেবিজি গ্রুপের’ একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হয়। অপ্রতিম হত্যার মূল হোতা সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনও একসময় এই গ্রুপের সদস্য ছিলেন বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই একটি গ্যাং গড়ে তুলছিলেন। এ ছাড়া সিবিক (সিবিকে), মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াডসহ অন্তত ২৫টি কিশোর গ্যাং কুমিল্লা শহর ও আশপাশে সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য।
কিশোর গ্যাংয়ের এমন অদ্ভুত নামকরণের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল আলম শাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিশোর অপরাধে জড়িত নেতাদের সাম্প্রতিক অভিযানে আটকের পর আমরা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। এমন নামকরণের পেছনে তাদের ভাষ্য— মূলত প্রথমে তারা টিকটক বা ফেসবুকে মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি হতে পারে, এমন নাম ঠিক করে গ্রুপ খোলে। কারও গ্রুপের নাম যেন অন্য গ্রুপের সঙ্গে না মেলে, সেটি মাথায় রেখে অদ্ভুত সব নাম দেয়। এ ছাড়া গ্রুপের নাম বললেই যেন ওই কিশোর গ্যাং কে চালায়, সেটি অন্য গ্রুপ বুঝতে পারে, নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে এটাও একটা উদ্দেশ্য থাকে।’
নগর বা গ্রাম—যেখানেই কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান হয়েছে, তার পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের কুমিল্লা শাখার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাং–বিরোধী যে অভিযান পুলিশ–প্রশাসন শুরু করেছে, তা অব্যাহত রাখা উচিত। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সচেতনতা দরকার।












