স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়া
জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
সশস্ত্রবাহিনী দিবসের সংবর্ধনায় অংশ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশ গঠন ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সশস্ত্রবাহিনী সর্বদাই জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। গতকাল সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে সেনাকুঞ্জে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সশস্ত্রবাহিনী দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আপনাদের সকলকে স্বাগত জানাই। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, যুদ্ধাহত এবং অন্যান্য সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। একইসঙ্গে আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সকল শহীদ, আহত এবং অংশগ্রহণকারী সর্বস্তরের মানুষের প্রতি, যাদের দুঃসাহসিক আত্মত্যাগ আমাদের জন্য দেশ পুনর্গঠনের একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জন্ম ১৯৭১ সালের রণক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর সেনাবাহিনীর সঙ্গে নৌ ও বিমান বাহিনী সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল বলেই ২১শে নভেম্বরকে মুক্তিযুদ্ধের একটি মাইলফলক হিসেবে গৌরবের সঙ্গে পালন করা হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্রবাহিনীর সংগ্রামের সূচনা ঘটে ২৫শে মার্চের রাত থেকেই। ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
আমরা যদি বিজয় অর্জন না করতাম তাহলে এই বীর সেনাদের মৃত্যুদণ্ড ছিল অনিবার্য, অসহনীয় হয়ে যেতো তাদের পরিবারের সকল সদস্যের জীবন।
তিনি বলেন, মুক্তিকামী সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অকুতোভয় বীর সেনানিরা জীবনের পরোয়া না করে, পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তারাই এদেশের আপামর জনসাধারণকে সাহস জুগিয়েছেন, মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জল-স্থল ও আকাশপথে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এনেছেন। যুদ্ধ বেগবান ও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে তখন বাংলাদেশ ফোর্সেস গঠন করা হয়েছিল। যার অধীনে ১১টি সেক্টরে দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, এরই চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখি ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সম্মিলিত অভিযানে। পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে এই যৌথ অভিযানই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় এনে দিয়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশ গঠন ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় আপনারা সর্বদাই জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও চলমান দেশ পুনর্গঠন ও সংস্কারের কাজেও সশস্ত্রবাহিনী বরাবরের মতোই মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অব্যাহতভাবে দেশের মানুষের আস্থার প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি অনুগত বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী তাদের পেশাগত দক্ষতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে দেশের জন্য ত্যাগ ও তৎপরতার এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে আসন্ন নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। একটি নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনে আমি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।
একটি শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে আমরা সকল বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক সহাবস্থানে বিশ্বাসী জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তথাপি যেকোনো আগ্রাসী বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের সদা প্রস্তুত এবং সংকল্পবদ্ধ থাকতে হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাহিনীগুলোতে যুগোপযোগী প্রযুক্তি সংযোজনের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
বিগত ৩৭ বছরে জাতিসংঘে আমাদের শান্তিরক্ষীরা সফলতার সঙ্গে ৪৩টি দেশে ৬৩টি মিশন সম্পন্ন করেছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, বর্তমানেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১০টি মিশনে আমাদের শান্তিরক্ষীরা নিয়োজিত আছেন। এ ছাড়া, বাংলাদেশ বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ নারী শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবেও বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ একটি দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য নাম। এজন্য আমি সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা যাতে বিশ্বের চ্যালেঞ্জিং এবং বিপজ্জনক অঞ্চলসমূহে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে সেজন্য তাদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার একান্ত বৈঠক/জামায়াত-এনসিপি’র নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার বিকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিএনপি চেয়ারপারসন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন। ওদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জামায়াত এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতারা। অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে তারা সাক্ষাৎ করেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার রাজধানীর সেনানিবাসে সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সাইডলাইনে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও বেগম খালেদা জিয়া পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময় করেন। প্রধান উপদেষ্টা এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজ নেন এবং তার সুস্থতা কামনা করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিএনপি চেয়ারপারসনও প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি প্রধান উপদেষ্টার সহধর্মিনী আফরোজী ইউনূসের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং শুভকামনা জানান। এ সময় খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্রবধূ শর্মিলা রহমান সিঁথি উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন সশস্ত্রবাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেনাকুঞ্জে পৌঁছালে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান তাকে অভ্যর্থনা জানান। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর গুলশানে বাসভবনে (ফিরোজা) পৌঁছান তিনি। গত বছরও সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অংশ নিয়েছিলেন।
গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসে অনুষ্ঠানস্থলে যান খালেদা জিয়া। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রধান উপদেষ্টার ডান পাশের চেয়ারে বসেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে একই গাড়িতে ছিলেন তার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন চেয়ারপারসনের গাড়ি বহরের সঙ্গেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যান। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদও সেনাকুঞ্চের এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সাক্ষাৎ: ‘সশস্ত্রবাহিনী দিবস-২০২৫’ উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিন বাহিনীর প্রধানগণ। গতকাল সকালে ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সকালে ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং ভিজিটর বইতে স্বাক্ষর করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়াও খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে ‘সেনাবাহিনী পদক’ প্রদান এবং বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস ‘ট্রেনিং কমপেনডিয়াম’-এর মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ ছাড়াও সেনাকুঞ্জে সশস্ত্রবাহিনী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন। সেনাকুঞ্জে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

