ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
লন্ডন, ৮ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার প্রধানতম কারণ ছিল বাস্তবতা-বিবর্জিত লোভ। এই লোভেই মত্ত হয়ে মীরজাফর ও ঘষেটি বেগমেরা দেশটিকে বিকিয়ে দিয়েছিল ইংরেজদের হাতে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বিদেশি শক্তির চেয়ে দেশীয় বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল বাংলার পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই লোভ ও চাটুকারিতার ধারাবাহিকতা আজও আমাদের জাতীয় চরিত্র থেকে মুছে যায়নি।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই এর নগ্ন প্রমাণ পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে পদ-পদবি ও অর্থের লোভ দেখিয়ে টানা সাড়ে পনেরো বছর দুর্দান্ত প্রতাপে দেশ শাসন করেছেন। এই শাসনামলে খুন, গুম, দমন-পীড়ন ও সীমাহীন লুটপাটের মাধ্যমে একটি ভীতিকর দুঃশাসন কায়েম হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই শাসনের পরিণতি হয়েছে পলায়ন। কিন্তু রক্তাক্ত, দুঃখী বাংলার রক্ত এখনও শুকায়নি। বিচার কার্য শেষ হয়নি, ক্ষত এখনও তাজা।
এমন এক বাস্তবতায় জাতির সামনে ছিল একটি ঐতিহাসিক সুযোগ—সকল প্রকার দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সেই চিরচেনা লোভ। মুহূর্তেই আমরা ভুলে গেছি অনাচার, অবিচার এবং হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ। সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠার আগেই শুরু হয়েছে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ।
ষড়যন্ত্রকারীরা বসে থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বারবার তাদের ফাঁদে পা দেব? ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটনে বাধা, সংবিধান সংশোধনে বাধা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তর থেকে দোসরদের সরাতে বাধা—সবশেষে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নানামুখী তৎপরতার মূলে রয়েছে একটিই কারণ: লোভ এবং নিজস্ব স্বার্থ।
এখানে জাতির ভবিষ্যৎ গৌণ। দেশের বারোটা বেজে গেলেও তাতে কারও কিছু আসে যায় না। জনআকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় বসানোর মহা আয়োজন চলছে। এই আয়োজনে দেশি ও বিদেশি চক্রান্ত জড়িত বলেই অনুমেয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আজ সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছে। নিঃসন্দেহে লক্ষণ ভালো নয়।
সবকিছু মিলিয়ে ক্রমেই মনে হয়—আমরা কি আদৌ স্বাধীন কোনো জাতিসত্তা হিসেবে টিকে থাকার যোগ্য? নাকি গোলামির শৃঙ্খলেই আমাদের স্বস্তি? ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যখনই আত্মমর্যাদার চেয়ে লোভ বড় হয়ে ওঠে, তখনই স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। যদি এই মানসিকতা থেকে আমরা বেরিয়ে না আসি, তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও প্রকৃত মুক্তি আমাদের অধরাই থেকে যাবে।












