ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে প্রকাশ্য মন্তব্য ও মূল্যায়ন আসছে। এই প্রবণতা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক রীতি, কূটনৈতিক শালীনতা এবং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপের শামিল।
নির্বাচন একটি দেশের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়। অন্য রাষ্ট্র এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণ করতে পারে—এটা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু কোনো দেশের নির্বাচন নিয়ে আগাম মতামত দেওয়া, কে জিতবে বা কোন পক্ষ ক্ষমতায় থাকবে সে বিষয়ে প্রকাশ্যে ধারণা দেওয়া কেবল অনৈতিকই নয়, বরং তা সংশ্লিষ্ট দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচন হওয়ার আগেই যদি কোনো দেশ এ ধরনের মন্তব্য করে, তাহলে সেই মন্তব্যকে বস্তুনিষ্ঠ বা নিরপেক্ষ বলার কোনো সুযোগ থাকে না।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভোটের পরিবেশ নষ্ট হলে তার দায় বর্তমান সরকার বা আওয়ামী লীগের ওপরই বর্তাবে। এই বক্তব্য নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ভারতের সহযোগিতায় ক্ষমতায় থাকা একটি রাজনৈতিক শক্তি ভোটের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেনি—এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যদি ভারতের কোনো নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে থাকে, তাহলে তা কূটনৈতিক রীতিতে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। প্রকাশ্য মন্তব্য, চাপ সৃষ্টি বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বক্তব্য দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না—বরং এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, যদি পতিত স্বৈরাচার বা তাদের সহযোগী কোনো শক্তি ভোটের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তবে তা প্রতিহত করার দায়িত্ব সরকারেরই। এজন্য প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রয়োজনে এই প্রস্তুতি আরও জোরদার করা দরকার, যাতে জনগণ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভারতের নগ্ন ও নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশে তাদের অনুগত বা ‘পুতুল সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজেদের নেটওয়ার্ক ও ঘাঁটি তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে গেছে। খুন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনায় ভারতীয় বাহিনী বা তাদের সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত আজও হয়নি, তথাপি অভিযোগগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অথচ একই সময়ে ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। নাগরিকত্ব আইন, ধর্মীয় সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় মদদে বৈষম্য—সব মিলিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং অন্য দেশের গণতন্ত্র বা নির্বাচন নিয়ে নসিহত করার আগে ভারতের উচিত নিজের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া।
নিজেদের অনুগত সরকারকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক অসম ও অন্যায্য চুক্তি হয়েছে—যার ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব চুক্তি দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং শোষণের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশের জনগণ আর কোনো বিদেশি আধিপত্য বা হেজেমনিকে মেনে নেবে না। কোনো পুতুল সরকার, কোনো চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থা এই দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ—অন্য কোনো রাষ্ট্র নয়। এই সত্য যত দ্রুত সবাই মেনে নেবে, ততই এই অঞ্চলের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত হবে।












