জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের জন্য নির্ধারিত নতুন পোশাক পরতে আগ্রহী মাত্র ০.৮৪ শতাংশ সদস্য। বিপরীতে আগের পোশাকে ফিরে যেতে চান ৯৬.৫৭ শতাংশ পুলিশ সদস্য। আর বর্তমান বা আগের নয়, একেবারে নতুন পোশাক চান ২.৫৯ শতাংশ সদস্য।
পোশাক নিয়ে পুলিশের এক জরিপে বাহিনীর সদস্যদের এমন মতামত উঠে এসেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়। এরই প্রেক্ষাপটে সারাদেশে পুলিশের পোশাক নিয়ে জরিপ শুরু করা হয়।
গত শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও সব ইউনিট প্রধানের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে তিনটি বিষয় জানতে চাওয়া হয়। আগের পোশাকের পক্ষে কত শতাংশ পুলিশ সদস্য, কত শতাংশ বর্তমান পোশাকে সন্তুষ্ট এবং কত শতাংশ একেবারে নতুন পোশাক চান। সোমবারের মধ্যে নিজ নিজ ইউনিটের সদস্যদের মতামত নিয়ে তা পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠাতে বলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার তিন মাস আগে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে। নতুন সেই পোশাক নিয়ে এরই মধ্যে নিজেদের অস্বস্তির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দাবি, মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করেই সেই পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল।
পুলিশের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পোশাকের বিষয়ে সব পর্যায়ের সদস্যদের মতামতের ফলাফল জানতে চায় পুলিশ প্রশাসন। অধিকাংশ সদস্য যে পোশাকের পক্ষে মত দেবেন, সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি পোশাক পরিবর্তনের দাবিও ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন পোশাক অনুমোদন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোশাক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া মতামত উপেক্ষিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, লৌহ (আয়রন) রঙের নতুন ইউনিফর্ম অন্য বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। রাতে দায়িত্ব পালনের সময় এটি দৃশ্যমান হয় না। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাকের সঙ্গে পুলিশের পোশাক মিলেও যায়। এছাড়া দেশের আবহাওয়ার জন্যও এটি পুরোপুরি উপযোগী নয়।
পুলিশের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকটা তড়িঘড়ি করে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়। এতে একজন উপদেষ্টা ও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দরপত্র আহ্বানের পর ১৪১ কোটি টাকার কাপড় কেনার কাজ পায় নোমান গ্রুপ। ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে মামলা রয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের বছরে সরকারিভাবে পাঁচ সেট পোশাক দেওয়া হয়। প্রায় ২১ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোশাকে পরিবর্তন আনা হয়। এর আগে সর্বশেষ ২০০৪ সালে পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, র্যাব ও অঙ্গীভূত আনসারের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত জানুয়ারিতে এই তিন বাহিনীর জন্য নতুন পোশাক নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সমালোচনা দেখা দিলে র্যাব ও অঙ্গীভূত আনসারের পোশাকে আর পরিবর্তন আনা হয়নি।
গত বছরের ১৪ নভেম্বর থেকে দেশের সব মহানগর পুলিশের সদস্যরা লৌহ রঙের নতুন পোশাক পরে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে জেলা পুলিশেও তা কার্যকর করার কথা বলা হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ পুলিশের জন্য যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, দেশের আবহাওয়া এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।
পুলিশের পোশাকের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন এবং ১০ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার একটি কমিটির দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশের আগের পোশাক নির্ধারণ করেছিল। সে সময় আবহাওয়া, দিনে ও রাতে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে দৃশ্যমানতা, পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং এবং অন্য বাহিনীর সঙ্গে সাদৃশ্য না থাকা—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে নন। বরং তারা আগের পোশাককে বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করেন।












