ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসী হওয়ার স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে বহু প্রাণ। ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা জেনেও অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যেকোনো মূল্যে তাদের স্বপ্নের পেছনে ছুটছেন। এর পেছনে কাজ করছে মানব পাচার চক্র। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে বিশেষ করে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ নির্দিষ্ট কিছু এলাকার লোকজনকে প্রলোভন দিয়ে এভাবে ইউরোপ নেওয়ার স্বপ্ন দেখায় দালাল চক্র। বছরের পর বছর এসব দালাল ও মানব পাচার চক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যেন কোনো কাজেই আসছে না। ফলে এসব চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই প্রতি বছর অন্তত ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের দিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানব পাচারের শিকার হন বাংলাদেশিরা। গত বছরের প্রথম ৬ মাসের সমুদ্রপথে ৯ হাজার ৭৩৫ জন পাচার হয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। মানব পাচার চক্রটি সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানব পাচার চক্রের অপতৎপরতায় রাশ টানতে পারছে না।
গত শুক্রবার লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় ইউরোপে প্রবেশের সময় গ্রিস উপকূল থেকে চার বাংলাদেশির লাশ ও ২১ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সে যাত্রায় মারা গেছে ১৮ বাংলাদেশি। তথ্য মতে, উদ্ধার হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি জানান, লিবিয়া থেকে যাত্রার সময় নৌকায় অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি ছিলেন। নিখোঁজ ২২ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জন বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারেন। ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও অনাহারের কারণে তারা মারা গেছেন। যাদের লাশ পাওয়া যায়নি, নৌকায় থাকা এক মানব পাচারকারীর নির্দেশে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর এটি দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে সাগরে ভাসতে থাকে। প্রায় ছয় দিন সমুদ্রে ভাসমান থাকার পর ক্রিটের দক্ষিণে প্রায় ৫৩ নটিক্যাল মাইল দূরে নৌকাটি উদ্ধার করা হয়।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ফ্রন্টেক্সের এ মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে শুধু ভূমধ্যসাগর হয়ে রাবারের নৌকায় চেপে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী। এসব অভিবাসীর বেশির ভাগ বাংলাদেশ, সোমালিয়া ও পাকিস্তানের নাগরিক। এ সংখ্যা গত বছরে তুলনায় ৫২ শতাংশ কম হলেও সমুদ্রপথের এ ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মৃত্যুর হার আগের তুলনায় বেড়েছে। এই দুই মাসেই ভূমধ্যসাগরে প্রায় ৬৬০ জন অভিবাসী মারা গেছেন। খারাপ আবহাওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান ব্যবহারের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়েই সবচেয়ে বেশি মানুষ ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশ করেন, যা মোট অবৈধ অভিবাসীর প্রায় ৩০ শতাংশ।
অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে মৃত্যুঝুঁকি জেনেও কেন বাংলাদেশিরা এ পথ বেছে নিচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের একটি সংকট অবস্থা থেকে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকার এ ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। বিশেষ করে যারা প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ পথে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাঠাচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বৈধ পথে প্রবাসে যাওয়ার ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। দেশে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে কর্মমুখী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার অপরাধীদের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে জোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।












