চট্টগ্রাম ব্যুরো ও বাঁশখালী প্রতিনিধি
ছবি: সংগৃহীত
পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশের পরে স্বাধীন হয়েও কাজ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এখন আর পেছনে পড়ে থাকার সুযোগ নেই; দেশ গঠনে সবাইকে কাজ করতে হবে।
রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুরে বাঁশখালীর পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে এ সব কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খেয়াল করেছি, গত কয়েকদিন ধরে কিছু মানুষ এ সব নিয়ে বিভ্রান্ত তৈরি করার চেষ্টা করছে। আপনাদেরকে পরিস্কারভাবে বলতে চাই, বিএনপি সরকার সংসদে পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে। আপনাদের যদি পরিকল্পনা থাকে আসুন, জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন। কিন্তু বিভ্রান্তিকর কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবেন না, জনগণের শান্তি নষ্ট করবেন না।
তিনি বলেন, বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণের সমর্থন থাকলে আমাদের জনগণের স্বার্থে প্রত্যেকটা কর্মসূচি আমরা বাস্তবায়নে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করতে। যাতে করে প্রত্যেকটা মানুষ দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য অপেক্ষা করেছি। এখন অপেক্ষা করে বসে থাকলে চলবে না, আমাদের কাজ করতে হবে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। মিল কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আমাদেরকে শিল্পের বিপ্লব ঘটাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়দিন আগে বন্যা হলো অতিবৃষ্টির কারণে। এ বন্যায় বহু মানুষের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে। আল্লাহর রহমতে ১০০ বাড়ির চাবি তুলে দিতে পারছি। কিছু দুস্থ মহিলাকে আমরা চাল দিয়ে সহযোগিতা করেছি। বর্তমান সরকারকে আপনারা নির্বাচিত করেছেন, এ বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচিত করেছে। এ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এ দেশের মানুষের পাশে থাকা, সুখে দুঃখে থাকা, মা-বোনদের পাশে থাকা, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তরুণ সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এ জন্যই নির্বাচনের সময় আমরা বলেছিলাম, বিএনপি যদি আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের ভোটে সরকার গঠনে সক্ষম হয় তাহলে আমরা মূল কয়েকটি কাজে হাত দেব। তার মধ্যে একটি কাজ ছিল এদেশের মায়েদের সহযোগিতার জন্য, এদেশের নারীরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে সে জন্য আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড ঘরে ঘরে পৌঁছাব। আপনারা দেখেছেন, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই আমরা সেই ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রজেক্টের কাজে হাত দিয়েছিলাম এবং আল্লাহর রহমতে পাইলট প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এ মাসের ১৬ তারিখ থেকে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু করছি। সমগ্র দেশে এ বছর প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। এ উপজেলার মধ্যে ১০-১২ হাজার পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড আগামী অর্থবছরের মধ্যে তুলে দেব এবং আগামী চার বছর ধরে এটি চলবে। আরও অনেক মা-বোনেরা ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসবেন। আমাদের লক্ষ্য ছিল ভাইদের পাশাপাশি যাতে বোনেরাও সংসারের হাল ধরতে পারে। একটি স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তুলতে পারে, সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে। সে জন্য মায়েদের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য এ ব্যবস্থা করছি। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ডেরও ব্যবস্থাও করেছি।
তিনি বলেন, আলোচনা করে আমরা লবণের মূল্য নির্ধারণ করেছি। যে মূল্য পেলে লবণ চাষি ভাইদের স্বাবলম্বিতা, অর্থনৈতিকভাবে তারা সচ্ছল হবে আস্তে আস্তে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে আমরা সেই দামটি সকলকে জানিয়ে দেব। যার ফলে লবণ চাষি ভাইদের আগের মতো কষ্ট পোহাতে হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি মাতারবাড়ী গিয়েছিলাম, মাতারবাড়ীতে পুরো দেখে আসলাম। মীরসরাই থেকে শুরু করে সমগ্র অঞ্চল হেলিকপ্টারে আমি দেখেছি। কেন দেখেছি? কারণ আমাদের সামনে বিশাল সমুদ্র, এটি হচ্ছে বাংলাদেশের সম্পদ। এই সমুদ্রের মালিক হচ্ছে এই বাংলাদেশের জনগণ। এই সমুদ্রকে কীভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ব্যবস্থা উন্নত করা যায়, কীভাবে আমরা মীরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন মিল ফ্যাক্টরি স্থাপন করার মাধ্যমে এ দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যবস্থা করতে পারব সেই পরিকল্পনা কীভাবে গ্রহণ করা যায় তার জন্য আজ মাতারবাড়ী গিয়েছিলাম। কয়েকদিন আগে আপনারা দেখেছেন, চট্টগ্রামে চায়নাকে বিরাট একটা জায়গা দিয়েছি। চায়না থেকে আমি ঘুরে এসেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। সেখানে তারা কয়েকশ মিল কারখানা তৈরি করবে। সমগ্র চট্টগ্রামের মানুষ ইনশাআল্লাহ সেখানে কাজ করার সুযোগ পাবে। তার ফলে একদিকে বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে, একই সঙ্গে বহু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করব। সেই মুদ্রা দিয়ে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করব, বাংলাদেশের মানুষের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলব, স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলব। উপজেলা পর্যায়ে ৫০ বেডের হাসপাতালের ৩০ বেড করে গিয়েছিলেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া যখন সরকার গঠন করেছিলেন ২০টি বেড যোগ করেছিলেন। আজকে আপনাদের বর্তমান বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, প্রত্যেক উপজেলার মানুষ যাতে ভালোভাবে স্বাস্থ্যসেবা পায়, সে লক্ষ্যে দেশের ৫০৩টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ বেডে উন্নীত করব ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, এ কাজগুলো যদি আমাদের করতে হয়, মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়, এ দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য যদি বিদেশি বিনিয়োগকারী যারা আছে তাদেরকে উৎসাহিত করে মিল-কারখানা স্থাপন করতে হয় তাহলে তার পূর্বশর্ত হচ্ছে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা থাকতে হবে। দেশে বিশৃঙ্খলা থাকলে চলবে না। বাজারে যখন গণ্ডগোল হয়, তখন দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। তার কারণ, ব্যবসায়ীরা চায়, এই গণ্ডগোলের কারণে তার ব্যবসার ক্ষতি না হয়। ঠিক একই ভাবে, দেশিয় বা বিদেশি বিনিয়োগকারী যারা আছে তারা চাইবে তার মিল কারখানায় উৎপাদিত পণ্য ঠিকভাবে বন্দর দিয়ে নির্বিঘ্নে যেতে পারে বা তার কাঁচামাল যেন সঠিকভাবে আসতে পারে। রাস্তাঘাটে যেন শান্তি থাকে। সে জন্য আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। যারা শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায়, তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যদি দেশের সন্তানদের সুন্দরভাবে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে হয়, স্কুল-কলেজ সুন্দরভাবে তৈরি করতে হয়, শিক্ষকদেরকে যদি ট্রেনিং দিতে হয়, ছাত্র-ছাত্রীদেরকে যদি নতুন করে বই দিতে হয়, তাহলে আমাদেরকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে হবে। একই ভাবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যারা বিভ্রান্তি তৈরি করতে চায়, তারা যেন কখনও সে সুযোগ না পায়। কারণ বিভ্রান্তবারীরা যদি বিভ্রান্ত করার সুযোগ পায় ক্ষতিগ্রস্থ হবে জনগণ। তাই আজকে বাংলাদেশের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব নাকি আমরা ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত থাকব, নাকি আমরা বিভ্রান্তকারীদের সঙ্গে থাকব।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি, বিগত স্বৈরাচার আমলে এ দেশের জ্বালানি বা বিদ্যুৎ খাতকে গুটি কয়েক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। যারা এ দেশের মানুষের পক্ষে নয়। জনগণের স্বার্থে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা যদি করতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে কিছু সময়ের প্রয়োজন। আমরা এর ভেতরে এ সব কাজে হাত দিয়েছি। ইনশাল্লাহ, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের সামনে আগামী ১০ বছর আমাদের জ্বালানি পরিকল্পনা কী হবে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কী হবে, সে প্রস্তাবনা আমরা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব।
অনুষ্ঠানে তিনি বন্যাকবলিত ১০০টি পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি দেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে পুনর্বাসন অনুদান ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং স্বাগত বক্তব্য দেন মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা আবদুল করিম।












