জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনজুড়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অনলাইন তথ্যপরিসরে ছড়িয়েছে নানা ধরনের অপতথ্য। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের ঘিরে বিভ্রান্তিকর দাবি, পুরোনো ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টের মাধ্যমে এসব অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন সরকারের এই সময়কাল দেশের পরিবর্তিত তথ্যপরিসর ও অনলাইন বিভ্রান্তির নতুন ঝুঁকিকেও সামনে এনেছে।
বিএনপি সরকার শপথ নেওয়ার পরদিন অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ১৮০ দিনে সরকারকে জড়িয়ে দেশের তথ্যপরিসরে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অপতথ্যের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। এ সময়ে সরকার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ অপতথ্যই ছিল সরকারের বিপক্ষে বা নেতিবাচক বার্তা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রচারিত। এসব অপতথ্যের সিংহভাগেই সরকার, এর নেতৃত্ব ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অরাজনৈতিক সরকার হিসেবে ক্ষমতায় আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের অধীনে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরে বাংলাদেশ। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গুজব ও অপতথ্যের প্রচার যেন নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘিরে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ে। বিএনপি সরকারের বেলায় শুরু থেকেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করেছে রিউমর স্ক্যানার। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে পরবর্তী মাসগুলোতে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে অপতথ্য হয়ে উঠেছিল যেন নীরব সঙ্গী। এআই-নির্ভর কনটেন্ট, সার্কাজম পেজের বিস্তারসহ অপতথ্য ছড়ানোর নানা কৌশল এর মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকারে থাকা সংশ্লিষ্টদের ঘিরে ছড়ানো অপতথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। কোনো ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে সার্কাজম পেজ হিসেবে পরিচিত কিছু পেজ থেকে ভুয়া মন্তব্য বা বক্তব্য তৈরি করা হয়। পরে এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য ফেসবুক গ্রুপ ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে। কখনো কখনো যাচাই না করেই এসব বক্তব্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা গণমাধ্যমের আলোচনাতেও উঠে আসে।
একই সময়ে এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ইস্যুভিত্তিক বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও দেখা গেছে। এর সঙ্গে পুরোনো ভিডিও, ভুয়া ফটোকার্ড এবং প্রমাণহীন তথ্য যুক্ত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে অপতথ্য প্রচারের সমন্বিত ক্যাম্পেইনের রূপ নিয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে এমন অন্তত ১০টি ইস্যুতে (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০) অপতথ্যের ক্যাম্পেইন শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে কয়েকটি ক্যাম্পেইনের পেছনে থাকা মূল হোতাদেরও শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে রিউমর স্ক্যানার।
সরকারের প্রথম ছয় মাস সময়ে অপতথ্যের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে ঘিরে মোট ১৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৭৮ শতাংশই ছিল নেতিবাচক। এসব অপতথ্যের ধরণ বিশ্লেষণেও দেখা যায়, এসব কনটেন্ট তৈরিতে একাধিক প্রচলিত ও নতুন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
তারেক রহমানকে জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৪টি অপতথ্য এসেছে সার্কাজম পেজের পোস্টের মাধ্যমে। এরপরেই রয়েছে তার নামে ছড়ানো ভুয়া বক্তব্য (৩০টি) এবং গণমাধ্যমকে নকল করে প্রচারিত ভুয়া ফটোকার্ড (২২টি)। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত ১৯টি কনটেন্টও শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া পুরোনো ছবি-ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে ৭টি ক্ষেত্রে এবং সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে ৫টি অপতথ্যে। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু সম্পূর্ণ বানোয়াট তথ্য নয়, বরং ভুয়া বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি ফটোকার্ড, পুরোনো কনটেন্টের পুনর্ব্যবহার, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট এবং এআই-নির্ভর কনটেন্টসহ এমন বিভিন্ন কৌশলের সমন্বিত ব্যবহারও দেখা গেছে।
বিএনপি সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সহকারিদের ঘিরে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২৬২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ অপতথ্যই ছিল নেতিবাচক। সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্য ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ—তাকে ঘিরে ৪৮টি অপতথ্যই ছিল নেতিবাচক। এরপর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ঘিরে ৩৩টি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে ২৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। ।
এসব অপতথ্যের ক্ষেত্রে ভুয়া ফটোকার্ড ও ভুয়া বক্তব্যের পাশাপাশি এআই-নির্ভর কনটেন্ট, সার্কাজম পেজের পোস্ট এবং পুরোনো ছবি-ভিডিও পুনরায় ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থাৎ, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে অপতথ্য ছড়াতে প্রচলিত ভুয়া তথ্যের কৌশলের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টও ব্যবহৃত হয়েছে।
সরকারে থাকা বিএনপির নারী নেত্রীদের ঘিরেও এই ছয় মাসে অপতথ্যের প্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সরকারে থাকা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে ঘিরে ৪টি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী আফরোজা খানম রিতাকে ঘিরে ১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। দুজনকে ঘিরে শনাক্ত সব অপতথ্যই ছিল নেতিবাচক।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্য ছিলেন দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান, তাকে জড়িয়ে ৫৮টি; গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ৩১টি, যিনি পরবর্তীতে দল থেকে বহিষ্কৃত হন; মারদিয়া মমতাজকে ঘিরে ১২টি এবং ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরকে ঘিরে ৪টি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া শাহজাহান চৌধুরি ও আমির হামজাকে ঘিরে ৩টি করে এবং রফিকুল ইসলাম খানকে ঘিরে ১টি অপতথ্য পাওয়া গেছে। জামায়াতের সংসদ সদস্যদের জড়িয়ে মোট ১১৬টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যদের মধ্যে হাসনাত আবদুল্লাহকে জড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫৯টি, দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে ২৭টি, ডা. মাহমুদা মিতুকে ঘিরে ২৬টি, আব্দুল হান্নান মাসউদকে ঘিরে ৭টি এবং নুসরাত তাবাসসুমকে ঘিরে ৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে দলটির সংসদ সদস্যদের জড়িয়ে ১২৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালাকে ঘিরে ১টি এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে ঘিরে ২২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, তালিকাভুক্ত এসব সংসদ সদস্যকে ঘিরে মোট ৩০৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে জ্বালানি, শিক্ষা, দুর্যোগ, অপরাধ ও ধর্মীয় বিষয় ঘিরেও ছড়িয়েছে অপতথ্য। সাভারে এনসিপির সমাবেশ, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী, মন্ত্রিসভা গঠন, বাজেট ও রাম মন্দির নিয়েও শনাক্ত হয়েছে বিভিন্ন অপতথ্য।












