শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
বিদুরে পৌঁছে আমাদের থামতে হলো। গাড়ি নিয়ে যাওয়ার আর পথ নেই। মহাসড়কের একটা অংশ ত্রিশূলী নদীতে মিশে গেছে।
নুয়াকোট জেলার পৌর শহর বিদুর কাঠমান্ডু থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে। এখানে নেপাল সেনাবাহিনীর যে প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে, সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে উদ্ধার অভিযান। সেখানে ফিল্ড ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরপর হেলিকপ্টার আসছে-যাচ্ছে। ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে, আর দুর্গত, অসুস্থ কিংবা মৃত মানুষ নিয়ে ফিরে আসছে।
আগের দিন ঢাকা থেকে এসে ৩০ আগস্ট সেখানেই পৌঁছাই আমরা। সামনে ত্রিশূলী বাজার। গাড়ি রেখে দুর্গম পাহাড়ের গা ঘেঁষে হাঁটা ধরলাম। যত সামনে এগোচ্ছি, ততই চোখের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ।
ত্রিশূলী নদীর দুই পাড়জুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন। পথে যাঁদেরই দেখা পেলাম, সবাই কেমন যেন হতবিহ্বল। ঘটনার আকস্মিকতা যেন এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
প্রায় দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর আবার থামতে হলো। হেঁটেও আর সামনে যাওয়ার উপায় নেই। এটাই ত্রিশূলী বাজার। দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় এখানে জমজমাট বাজার ছিল।
কাদামাটিতে আধা ডুবে আছে একটি পিকআপ। পাশেই কাদায় চাপা পড়ে আছে একটি মোটরসাইকেল। শুধু হেডলাইটটি দেখে বোঝা যাচ্ছে সেটি মোটরসাইকেল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিদ্যুতের তার। কোনো কোনো ভবন ধসে গেছে, কোনোটির ছাদ পর্যন্ত কর্দমাক্ত। ভবনের ভেতরে ঢুকে আছে লতাগুল্ম ও গাছের ডাল। সেগুলোর আটকে থাকার ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে, কতটা ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে এসেছিল কাদা, বালু আর পাথর মেশানো পানি।
ত্রিশূলীর বাতাসে বিকট গন্ধ। মুখের মাস্ক খোলা যায় না। গন্ধই বলে দিচ্ছিল, মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে কত লাশ।
বাজারে একটি ব্যাংকের ভবনও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাছে গিয়ে জানতে পারলাম, ঘটনার সময় ব্যাংকটির ভেতরে ২৩ জন কর্মী ছিলেন। তিনজন মাত্র বেঁচে ফিরেছেন। বাকি ২০ জনের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।
পুরো বাজারে কোথাও কোথাও কয়েক ফুট গভীর কাদা জমে আছে। সেখানে পা ফেললে আপাদমস্তক দেবে যাওয়ার আশঙ্কা। এর মধ্যেই উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী। সেনাসদস্যরা সেখানে আসা মানুষজনকে সতর্ক করছেন।
পাশ দিয়ে ধীরে বয়ে চলেছে ত্রিশূলী। দেখে কে বলবে, ২৬ আগস্ট কী প্রলয়ঙ্করী রূপ নিয়েছিল এই শান্ত নদী! মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে কেড়ে নিয়েছে কত মানুষের জীবন, বুকে করে নিয়ে গেছে মানুষের সর্বস্ব। সেকেন্ডের সিদ্ধান্তে কেউ বেঁচেছেন, কেউ কাদাস্রোতে ভেসে কিংবা তলিয়ে গেছেন।
বন্যার পর এসব এলাকা দু-তিন দিন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।
মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেকেই খুব কাছের মানুষকে হারিয়েছেন, অনেকে এখনো নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান করছেন। মৃতদেহটা হলেও যেন পাওয়া যায়—অনেকের এখন এটাই চাওয়া।
বেশির ভাগ মানুষই কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে খুব বেশি দূরে যাননি। আশপাশেই ছিলেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নিজেদের বাড়ির কাছে ছুটে এসেছেন। প্রিয়জনের খোঁজ করছেন।
এসব দেখে মনটা খুব ভার হয়ে গেল।
বদলে গেল পরিকল্পনা
ত্রিশূলী বাজারের সেই ব্যাংকভবন
ত্রিশূলী বাজারের সেই ব্যাংকভবনছবি: মো. গোলাম মোস্তফার সৌজন্যে
ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্টের উদ্যোগ কমিউনিটি ইনিশিয়েটিভ সোসাইটি বাংলাদেশের (সিআইএস) হয়ে নেপালে এসেছি আমরা চার সহকর্মী। আন্তর্দেশীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা জাপানভিত্তিক এশিয়া প্যাসিফিক অ্যালায়েন্স ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সদস্য সিআইএস। অন্য দেশ থেকে আসা জোটের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি। এ কাজে আমাদের সহযোগিতা করছে নেপাল মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ও নেপাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন।
বিদুর বা ত্রিশূলী বাজারে যাওয়ার আগে কাঠমান্ডুতে আমরা একটি যৌথ বৈঠক করেছিলাম। ভেবেছিলাম, চিকিৎসাসেবা নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাব। ঢাকা থেকে ওষুধও নিয়ে গিয়েছিলাম।
কিন্তু বিদুর ঘুরে পরিকল্পনা বদলাতে হলো। আশ্রয়শিবির ও দুর্গত এলাকায় আহত মানুষ খুব একটা নেই। যাঁরা আছেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই চিকিৎসাসেবা পেয়ে গেছেন। বেঁচে যাওয়া মানুষদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এখন তাঁদের প্রয়োজন আসলে সোলার লাইট, পোশাক, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মতো সামগ্রী। এসবের ব্যবস্থা করতে আবার কাঠমান্ডুর পথ ধরলাম আমরা।
দেবীঘাটের ইমাম
জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই ত্রাণকর্মী
জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই ত্রাণকর্মীছবি: মো. গোলাম মোস্তফার সৌজন্যে
দুর্গত এলাকায় যাওয়ার জন্য বাহন পাওয়াটাই একটা চ্যালেঞ্জ। কোনো চালক এক দিন গেলে পরে আর যেতে চান না। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, নেপালের কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেলের পরামর্শ নিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেব। ওষুধগুলো যেমন সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছি।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর একটি দল নিয়ে দেবীঘাটের পথ ধরলাম।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই এলাকার ধ্বংসযজ্ঞের খবর দেখেছি। একেবারে বিলীন হয়ে গেছে পুরো এলাকা। অনেক মানুষ শ্রীচন্দ্রজ্যোতি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বললাম। শিশুদের কাপড়চোপড়, তোয়ালে, চকলেট, সাবানসহ বিভিন্ন হাইজিন সামগ্রী দিলাম।
একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিবেদন প্রচারের পর দেবীঘাটের একটি মসজিদ নিয়ে বাংলাদেশেও বেশ আলোচনা হয়েছে। আমরা ওই এলাকায় গিয়ে মসজিদের ইমাম জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বললাম।
মসজিদের একটু দূরে পাশাপাশি দুটি সারিতে কয়েকটি বাড়ি ছিল। নদীর কাছাকাছি প্রথম সারির বাড়িগুলো একেবারেই ধুয়েমুছে গেছে। মসজিদের ভেতর দাঁড়িয়ে চোখের সামনে সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন জাহাঙ্গীর আলম। মসজিদের ভেতরেও পানি উঠেছিল। তবে খুব বেশি নয়, পায়ের পাতা ছোঁয়ার মতো। মসজিদের সঙ্গে থাকা তাঁর বাড়ির অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওই মুহূর্তটি তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তখন আপনার কী মনে হয়েছিল?’
তিনি বললেন, মনে হয়েছিল, বেঁচে ফেরার আর পথ নেই। চারপাশে প্রচণ্ড শব্দ। মাটির নিচে যেন ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। মাটি সরে যাচ্ছিল। চোখের সামনে ভবনগুলোতে ফাটল ধরছিল। মসজিদটিও কেঁপে উঠেছিল, দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছিল। সেই মুহূর্তে ভেবেছিলেন, হয়তো আর বাঁচবেন না।
জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। তাঁকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই দুর্যোগের পর হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে সবাই মসজিদে আসছেন। পরপর কয়েক দিন সেখান থেকেই পানি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
দেবীঘাট থেকে আবার বিদুরে ফিরে যাই। জেলা প্রশাসকের সমন্বয় কমিটির সঙ্গে দেখা করে আরও বিস্তারিত তথ্য নিয়ে কাঠমান্ডুর পথে রওনা করি।
কাঠমান্ডু ফিরতে গভীর রাত হয়ে যায়।
১২০ শিশুর মা-বাবার খোঁজ নেই
রাসুয়ার নীলকণ্ঠ সেকেন্ডারি স্কুল
রাসুয়ার নীলকণ্ঠ সেকেন্ডারি স্কুলছবি: মো. গোলাম মোস্তফার সৌজন্যে
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও শ্রীলঙ্কার সদস্যদের সঙ্গে আমাদের যে দলটি রাসুয়া জেলায় গিয়েছিল, তারাও ফিরে এল। দলটির সদস্যদের অভিজ্ঞতা শুনে মনটা আরও ভার হয়ে গেল।
রাসুয়ার নীলকণ্ঠ সেকেন্ডারি স্কুলে গিয়েছিলেন তাঁরা। বিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২০০ জনই নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষকও নিখোঁজ। শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুলে আসতে থাকা একটি স্কুলবাস বানের কবলে পড়েছিল। আবার সেদিন যারা স্কুলে না এসে বাড়িতে ছিল, তাদেরও কেউ কেউ হয়তো বেঁচে নেই। কারণ, বন্যার পানিতে কিছু এলাকার বসতি পুরোপুরি ভেসে গেছে।
তবে বিদ্যালয় ভবনটি রক্ষা পেয়েছে। বিদ্যালয়ে এসে পৌঁছানো শিক্ষার্থীরাও বেঁচে গেছে। এসব শিশুর প্রায় ১২০ জনের মা-বাবার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
খবরটা শুনে মন আরও খারাপ হয়ে গেল। দেশ-বিদেশে দুর্যোগ–দুর্বিপাকে কাজ করছি ৩০ বছর। ১৯৯৬ সালে টাঙ্গাইলের সখীপুরে ভয়াবহ টর্নেডোতে বিধ্বস্ত এলাকা থেকে শুরু করে গত বছর শ্রীলঙ্কার আকস্মিক বন্যা, নানা বিপর্যয় দেখেছি। কিন্তু নেপালের এই বিপর্যয় যেন সবকিছুর থেকে আলাদা।
এভাবে আসতে চাই না
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পরিবার নিয়ে নেপালের ধুলিখেলে গিয়েছিলাম। আমাদের সন্তান তখন খুব ছোট। তীব্র ঠান্ডায় ও কাবু হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ বাতিল করে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম।
কে জানত, তিন মাস পর আবার সেই ধুলিখেলেই যেতে হবে। ভূমিকম্পের পর উদ্ধার ও মানবিক সহায়তার কাজে চার মাস কাটাতে হবে।
এভাবে আর নেপালে আসতে চাই না। কোনো দুর্যোগের পর নয়, একজন সাধারণ পর্যটক হয়ে আসতে চাই হাসিমুখে, নেপালের পাহাড়, নদী আর মানুষের কাছে।
আ/আ












