Type / to choose a bশীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও ততই বাড়ছে। বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ এখন সংসদ সদস্য (এমপি) ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ধারণা, নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় এমপিদের সমর্থন বা আনুকূল্য পাওয়া গেলে নির্দলীয় এই নির্বাচনে দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রার্থী হওয়া এবং জয়ী হওয়ার পথ সহজ হবে।
স্থানীয় নির্বাচনে এমপিকেন্দ্রিক প্রভাব তৃণমূলে নতুন করে বিভাজন ও কোন্দলের আশঙ্কা তৈরি করেছে। দলের দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, এমপিদের পছন্দের ‘মাইম্যান’ প্রার্থী সামনে এলে ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতারা বঞ্চিত হতে পারেন। এতে ‘মাইম্যান’ বনাম ত্যাগী দ্বন্দ্বে সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তৃণমূল বিএনপি।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা এমপি ও জেলা নেতাদের সমর্থন পেতে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
এমপিদের পছন্দের ‘মাইম্যান’ বনাম ত্যাগী নেতাদের দ্বন্দ্বে কোন্দল বাড়তে পারে।
বিএনপি স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক অবস্থান বিবেচনায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চায়।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হস্তক্ষেপ ঠেকানোর কথা বললেও মাঠপর্যায়ে প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী বছরের শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রথম ধাপে নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৫০০ উপজেলা এবং সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ভেতরেও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিটি এলাকায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অবস্থান এবং অতীত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ঠেকাতেও প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় এমপির সমর্থন নিশ্চিত করাকেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার তৃণমূল নেতাদের এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পিএস ও এপিএসদের কাছে যোগাযোগ করতে দেখা যাচ্ছে।
সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা এমপিদের অফিস, সংসদ ভবন কিংবা বাসায় গিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন তারা। নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ও জনপ্রিয়তার কথাও জানাচ্ছেন।
তবে এ ধরনের তৎপরতা দলের ভেতরে নতুন করে বলয় তৈরির আশঙ্কা তৈরি করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন এমন নেতাদের সঙ্গে বর্তমান এমপিদের যে মতপার্থক্য রয়েছে, তার প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় এমপিরা ইউনিয়নভিত্তিক নিজেদের পছন্দের লোকদের সামনে আনছেন, এমন অভিযোগও রয়েছে। তাদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করানোর প্রস্তুতি চলছে বলে স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ দাবি করছেন। অন্যদিকে এমপির বলয়ের বাইরে থাকা দীর্ঘদিনের নেতারাও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। সঙ্গে টাকার বিনিময়ে আসছে অন্য দলের লোক।
দলীয় সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে উপজেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রার্থী বাছাইয়ে জেলা নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কোথাও সমস্যা তৈরি হলে প্রথমে জেলা এবং পরে বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা তা সমাধানের চেষ্টা করবেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়ন বা প্রার্থী ঘোষণা করবে না। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার খবরের কাগজকে বলেন, একেকটি ইউনিয়নে ১০ থেকে ১২ জন করে প্রার্থী হতে আগ্রহী। প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হলেও এ ক্ষেত্রে এমপি-মন্ত্রীদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে প্রার্থী বাছাইয়ে তাদের যেন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না থাকে, সেটিই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা সম্ভব হবে।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, দলের ক্ষতি হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড না করাই ভালো। ১৭ বছরের রাজনৈতিক অবক্ষয় থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের ক্ষতি না হয় এমন প্রার্থীই বাছাই করা উচিত।
ঝালকাঠি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন অভিযোগ করে খবরের কাগজকে বলেন, অসময়ে যারা দলকে আগলে রেখেছেন, তাদের বাদ দিয়ে বর্তমান এমপি অন্যদের নিয়ে কাজ করছেন। তার দাবি, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। জেলা বিএনপিকে প্রার্থী বাছাইয়ের একক দায়িত্ব দেওয়া হলে এসব সমস্যা রোধ করা সম্ভব হবে। নয়তো দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা বিএনপি অবশ্য প্রার্থী বাছাইয়ে গ্রুপিং এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. গোলাম জাকারিয়া খবরের কাগজকে বলেন, প্রার্থী হিসেবে তারও পছন্দের কেউ থাকতে পারেন, অন্য নেতারও পছন্দ থাকতে পারে। তার সিদ্ধান্ত ভুলও হতে পারে, অন্যজনের সিদ্ধান্ত সঠিক হতে পারে। তাই দল যখন প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়ে মতামত চাইবে, তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, দলে সবার নিজস্ব মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দল সবার। প্রার্থী বাছাইয়ে গ্রুপিংয়ের কারণে অতীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
জয়পুরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলজার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, তাদের প্রার্থী প্রস্তুত রয়েছে। জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। দু-একটি সমস্যা থাকলেও নির্বাচন এলে তা ঠিক হয়ে যাবে।
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত খবরের কাগজকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিয়েছেন। তৃণমূলে সাংগঠনিক অবস্থান ভালো, গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং বিগত আন্দোলনে সক্রিয় অবদান রেখেছেন এমন নেতাদের প্রার্থী করা হবে।
এমপিদের হস্তক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি শঙ্কার কারণ হতে পারে। তবে সবার আগে দল, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। কোনো এমপি নিজের বলয় কিংবা ‘মাইম্যান’ ঘিরে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করলে কেন্দ্রকে অবহিত করা হবে। কেন্দ্র সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একক প্রার্থী, সাংগঠনিক ঐক্য ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিলেও মাঠপর্যায়ে এমপিদের প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।












