• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

মতামত

বিমানবন্দরে আধুনিক সেবা চাই: মান্ধাতার আমল থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে

প্রকাশ: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:২৪
আপডেট: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:২৪

বিমানবন্দরে আধুনিক সেবা চাই: মান্ধাতার আমল থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ

একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়; এটি দেশের পরিচয়, সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও সেবার মানের প্রতীক। বিদেশি যাত্রীর প্রথম অভিজ্ঞতা যেমন দেশের ভাবমূর্তি গড়ে, তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশির আত্মমর্যাদার সঙ্গেও বিমানবন্দর জড়িত।

দুঃখজনকভাবে আমাদের বিমানবন্দরের অনেক সেবা এখনো ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। প্রযুক্তিনির্ভর একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কিছু ব্যবস্থাপনা যেন মান্ধাতার আমলেই রয়ে গেছে।

ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ লাইন ও যাত্রী দুর্ভোগ

দীর্ঘ অপেক্ষা, পর্যাপ্ত কাউন্টার বন্ধ থাকা এবং ধীরগতির কারণে ইমিগ্রেশনে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অথচ বিশ্বের অনেক বিমানবন্দরে ই-পাসপোর্ট, স্বয়ংক্রিয় গেট ও ঝুঁকিভিত্তিক দ্রুত যাচাই চালু রয়েছে।

ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব করতে হবে। এ জন্য—

  • পর্যাপ্ত কাউন্টার সার্বক্ষণিক চালু রাখা;
  • পিক আওয়ারে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ;
  • ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার কন্ট্রোল বাড়ানো;
  • দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ;
  • প্রতিটি কাউন্টারের সেবার সময় ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ;
  • অযথা কাউন্টার বন্ধ না রাখা;
  • প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, শিশু ও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন যাত্রীদের জন্য দ্রুত সেবা চালু করা জরুরি।

ইমিগ্রেশনের গতি ও দক্ষতার ওপর সামগ্রিক যাত্রীসেবার মান অনেকাংশে নির্ভর করে।

লাগেজ চুরি: কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

লাগেজ কেটে বা খুলে মূল্যবান জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যাত্রী যখন লাগেজ জমা দেন, তখন সেটি নিরাপদে ফেরত পাওয়া তাঁর মৌলিক অধিকার। লাগেজ চুরি ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট করে।

লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বিমান থেকে যাত্রীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের end-to-end tracking system চালু করতে হবে। পাশাপাশি—

  • হ্যান্ডলিং এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি;
  • নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফুটেজ সংরক্ষণ;
  • বায়োমেট্রিক প্রবেশাধিকার;
  • অভিযোগ তদন্তে পৃথক ইউনিট;
  • নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত ও জবাব;
  • প্রমাণিত চুরিতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা

নিশ্চিত করতে হবে।

একটি ট্রলির জন্যও কেন দীর্ঘ লাইন?

ভারী লাগেজ নিয়ে যাত্রীর প্রথম প্রয়োজন ট্রলি। তাই পর্যাপ্ত ট্রলি, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রলি পুনর্বিন্যাসের জন্য আলাদা কর্মীও রাখা যেতে পারে।

টয়লেটে টিস্যু হাতে দাঁড়িয়ে থাকা—এ কেমন যাত্রীসেবা?

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টয়লেটে পর্যাপ্ত টিস্যু, সাবান, পানি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত থাকা উচিত। প্রতিটি টয়লেটে থাকতে হবে—

  • ২৪ ঘণ্টার পরিচ্ছন্নতাকর্মী;
  • টিস্যু, সাবান ও বিশুদ্ধ পানি;
  • হ্যান্ড ড্রায়ার বা অতিরিক্ত টিস্যু;
  • পর্যাপ্ত ডাস্টবিন;
  • নিয়মিত পরিষ্কারের ডিজিটাল রেকর্ড।

বাইরে “শেষবার কখন পরিষ্কার করা হয়েছে”—এ তথ্য প্রদর্শন করলে জবাবদিহি বাড়বে।

বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বার কেন নোংরা থাকবে?

প্রবেশমুখের আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন ফুটপাত ও অগোছালো পরিবেশ দেশের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়। পর্যাপ্ত বিন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং ২৪ ঘণ্টার পরিচ্ছন্নতা টিম থাকতে হবে। কতক্ষণ পরপর পরিষ্কার হবে, কে দায়িত্বে থাকবেন এবং কাজটি হয়েছে কি না—সবকিছুর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মশার উপদ্রবও যাত্রী দুর্ভোগের কারণ

যাত্রীদের বসার স্থান, প্রবেশপথ, পার্কিং ও আশপাশে মশার প্রজননস্থল থাকলে তা নিয়মিত ধ্বংস করতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার ও পরিবেশবান্ধব কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে।

কার পার্কিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ

আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রবেশ-প্রস্থান, স্বয়ংক্রিয় টিকিটিং, ক্যাশলেস পেমেন্ট, গাড়ি শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ক্যামেরা থাকা উচিত। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পার্কিং আলাদা করতে হবে।

যাত্রী ওঠানামার জন্য dedicated drop-off ও pick-up zone রাখতে হবে, যাতে মূল সড়কে যানজট না হয়।

বিমানবন্দরে বাস ও মেট্রো সংযোগ জরুরি

বিমানবন্দরকে শুধু ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর রাখা যাবে না। শহরের সঙ্গে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন সংযোগ থাকতে হবে। বাসের জন্য নির্দিষ্ট টার্মিনাল ও সময়সূচি এবং মেট্রো বা অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সহজ সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

যাত্রী ওঠানামা শেষ হলে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনকে নির্ধারিত পার্কিং বা অপেক্ষমাণ এলাকায় চলে যেতে হবে। এ জন্য—

  1. যাত্রী ওঠানামার আলাদা লেন;
  2. বাসের নির্দিষ্ট বে;
  3. স্বল্পমেয়াদি drop-off zone;
  4. ট্যাক্সির আলাদা queue system;
  5. দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার জন্য দূরে holding area

চালু করা যেতে পারে।

শুধু নতুন ভবন নয়, দরকার নতুন ব্যবস্থাপনা

বিমানবন্দরের উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন বা চকচকে অবকাঠামো নয়; আসল মান নির্ধারিত হয় সেবা, গতি, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও জবাবদিহিতে।

তাই একটি পূর্ণাঙ্গ Passenger Service Management System গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি সেবার জন্য Service Level Standard নির্ধারণ করা যেতে পারে—

  • ইমিগ্রেশনে সর্বোচ্চ অপেক্ষার সময়;
  • লাগেজ পাওয়ার সময়;
  • অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়;
  • টয়লেট পরিষ্কারের বিরতি;
  • ট্রলি পাওয়ার অপেক্ষা;
  • নিরাপত্তা তল্লাশির গড় সময়।

এসব সূচক প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করে মাসিকভাবে প্রকাশ করা উচিত।

জবাবদিহি ছাড়া সংস্কার টেকসই হবে না

প্রতিটি বিভাগে জবাবদিহিমূলক কর্মকর্তা থাকতে হবে। যাত্রীকে অভিযোগ নিয়ে এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে ঘুরতে দেওয়া যাবে না।

২৪ ঘণ্টার একক অভিযোগ কেন্দ্র, মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও হটলাইন চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি অভিযোগের ট্র্যাকিং নম্বর থাকবে এবং যাত্রী অনলাইনে অগ্রগতি জানতে পারবেন। পাশাপাশি স্বাধীনভাবে যাত্রী সন্তুষ্টি জরিপ পরিচালনা করা উচিত।

আমার প্রস্তাব

বিমানবন্দরের সমস্যাগুলো সমাধানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে—

প্রথমত, প্রযুক্তিনির্ভর ইমিগ্রেশন চালু করে দীর্ঘ লাইন কমাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, লাগেজ ট্র্যাকিং, সিসিটিভি ও কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে চুরি বন্ধ করতে হবে।

তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত ট্রলি ও আধুনিক ট্রলি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, টয়লেটে টিস্যু, সাবান, পানি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, প্রবেশদ্বার ও আশপাশ সার্বক্ষণিক পরিষ্কার রাখতে হবে।

ষষ্ঠত, সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে।

সপ্তমত, ডিজিটাল পার্কিং ও পর্যাপ্ত drop-off/pick-up zone তৈরি করতে হবে।

অষ্টমত, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য বাস-মেট্রো সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

নবমত, যাত্রী ওঠানামা ছাড়া কোনো যানবাহনকে বিমানবন্দরের সামনে দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না।

দশমত, কর্মদক্ষতা পরিমাপ, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার

আমরা এমন বিমানবন্দর চাই, যেখানে যাত্রী দীর্ঘ লাইনে অসহায় হবেন না, লাগেজ নিরাপদে ফিরে পাবেন, ট্রলির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার করবেন এবং মশা-আবর্জনামুক্ত পরিবেশে সহজ গণপরিবহন পাবেন।

বিমানবন্দর জনগণের অর্থে পরিচালিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দেশের প্রবেশদ্বার। তাই এখানে সেবা হবে দ্রুত, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন, নিরাপত্তা কঠোর এবং ব্যবস্থাপনা জবাবদিহিমূলক—এটাই হওয়া উচিত মূলনীতি।

মান্ধাতার আমলের ধীরগতি থেকে বেরিয়ে এসে বিমানবন্দরকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও যাত্রীবান্ধব করতে হবে।

এখন সময় এসেছে শুধু ভবন নয়—বিমানবন্দরের সংস্কৃতি, ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবাকেও আধুনিক করার।

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com