ডেস্ক নিউজ
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। ঈদুল আজহার আগ পর্যন্ত জেলাভিত্তিক এবং কোরবানি ঈদের পর রাজধানীকেন্দ্রিক কর্মসূচি দেবে দলটি। যুগপতের নতুন কর্মসূচি হিসেবে এবার ৬৪ জেলায় সমাবেশ করবে বিএনপি ও মিত্ররা। ঢাকা অভিমুখে চূড়ান্ত পর্যায়ের কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে জেলাভিত্তিক এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে আবারও মাঠ জাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। চার পর্বে প্রতি শনিবার এ কর্মসূচি পালন করা হবে। প্রতি পর্বে ১০টি সাংগঠনিক বিভাগে ১৬টি করে সমাবেশ হবে। সেক্ষেত্রে কোনো বিভাগে একই দিন দুই জেলায়ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। গত ১২ অক্টোবর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিভাগীয় গণসমাবেশের আদলে এসব জেলা সমাবেশ
করতে চায় বিএনপি ও মিত্ররা। প্রতিটি সমাবেশে সাংগঠনিক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত সব জেলা থেকে নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করবেন। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলে ফের শোডাউন করতে চান বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
রোজার ঈদের পর ১৫ দিনের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনী ইস্যুতে কোনো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামেনি বিএনপি। ২০ মে সমাবেশের কর্মসূচি দিয়ে পুরোদমে মাঠে নামবে বিএনপি ও যুগপতের মিত্ররা। আগামী শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বিএনপির বিক্ষোভ-সমাবেশ থেকে যুগপতের নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে। গত মঙ্গলবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পর গতকাল বুধবার দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। উভয় বৈঠকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগ পর্যন্ত জেলা পর্যায়ে সমাবেশের এ কর্মসূচি চলবে। আর কোরবানির ঈদের পর রাজধানী অভিমুখে বিভিন্ন কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে। বিএনপির মিত্ররা নতুন কর্মসূচি হিসেবে ঢাকা থেকে বিভাগ অভিমুখে রোডমার্চের প্রস্তাব দিলেও তা নির্বিঘ্নে করতে পারা নিয়ে সংশয় থাকায় এ ধরনের কর্মসূচিতে আগ্রহী নন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এ ছাড়া এ মুহূর্তে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচিতেও যেতে চায় না দলটি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন কর্মসূচি হিসেবে বিভিন্ন প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় কোরবানির ঈদের পর রাজধানীকেন্দ্রিক কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেন নেতারা। সেক্ষেত্রে ঢাকা ঘেরাও, ঢাকামুখী রোডমার্চ, ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি আসতে পারে। আর আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে
হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিও দিতে পারে দলটি। তবে চূড়ান্ত আন্দোলনের পর্বটি ঠিক কখন শুরু করা হবে, কতদিন সেটি চলবে—তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা নানা হিসাব-নিকাশে দোটানায় রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে এইচএসসি পরীক্ষা, বর্ষা মৌসুম ও আগস্ট মাসকে বিবেচনায় রাখছে দলটি।
আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, ‘আন্দোলন একটা ঢেউয়ের মতো। এটা কখনো ওঠে, কখনো নামে। জনগণের পরিপ্রেক্ষিত বুঝে আন্দোলনটা করতে হয়। যেমন রোজার মাসে মুসলমানরা স্বাভাবিকভাবে রোজা রাখেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। আন্দোলনের যারা অংশীদার আছেন, শরিক দলগুলো আছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা চূড়ান্ত আলোচনার পর্যায়ে এসেছি। শিগগির নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে যুগপৎ আন্দোলন শুরুর পর থেকে ঈদুল ফিতরের আগ পর্যন্ত ঘুরেফিরে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, পদযাত্রা, সমাবেশ, গণসমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিলের মতো কর্মসূচি করেছে বিএনপি ও মিত্ররা।
জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বুধবার বিকেলে বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চ সরকারবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলনের পর্যায় হিসেবে ১২ মে শাহবাগে সমাবেশ করবে। সেখান থেকে আমরা নতুন কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করব। সেটা যুগপৎ অথবা মঞ্চগত কর্মসূচি হতে পারে। এর মধ্যে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গেও আমরা আলোচনা করব।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নতুন কর্মসূচি প্রণয়ন ছাড়াও যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র প্রণয়ন, গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে গণঅধিকার পরিষদের বেরিয়ে যাওয়া, জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী পালনসহ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, বৈঠকে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র হিসেবে গণতন্ত্র মঞ্চের দেওয়া ৩৫ দফা খসড়া রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গত সোমবার রূপরেখাটি বিএনপির কাছে হস্তান্তর করে গণতন্ত্র মঞ্চ। বিএনপির ১০ দফা দাবি ও রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখার সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফা এবং যৌথ ঘোষণাপত্র হিসেবে এরই মধ্যে বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের উদ্যোগে প্রণীত ৭ দফা খসড়া রূপরেখার সমন্বয়ে এই ৩৫ দফা খসড়া রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে বিএনপি ১০ দফা ও ২৭ দফা থেকে সরতে চায় না। দলটি ১০ দফার ভিত্তিতে পরিচালিত যুগপৎ আন্দোলন সফল করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সরকার গঠন করে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে চায়।
গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকার বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে ১০ দফার ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এরপর রাষ্ট্রের সার্বিক সংস্কারে ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখা ঘোষণা করে দলটি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা এবং চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’-এর আলোকে ২৭ দফার ওই রূপরেখা প্রস্তুত করা হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে কী কী করতে চায়, ওই রূপরেখার মধ্যে সেটা স্পষ্ট করেছে বিএনপি। পরে ২৭ দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সারা দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে সেমিনার এবং রূপরেখাটি পুস্তিকা আকারে ঢাকায় বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বিতরণ করে। বিএনপি নেতাদের দাবি, ১০ দফা দাবি ও ২৭ দফা রূপরেখা একটা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে, মানুষ এরই মধ্যে এটিকে গ্রহণ করেছে। সুতরাং ২৭ দফা থেকে তারা সরবে না। প্রয়োজনবোধে মিত্রদের অন্য দাবিগুলোকে ২৭ দফা রূপরেখায় উপদফা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বৈঠকে যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও কোনো সল্যুশন হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এখন গণতন্ত্র মঞ্চসহ যুগপতের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে একটি সমাধানে পৌঁছতে চায়। ফলে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণাপত্র প্রণয়নের বিষয়টি আপাতত ঝুলে গেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে গত শনিবার বেরিয়ে গেছে গণঅধিকার পরিষদ। তবে দলটি যুগপৎ আন্দোলনে পৃথকভাবে অংশগ্রহণ করবে। এদিকে গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে গণঅধিকার পরিষদের বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে বলে সন্দেহ মঞ্চের কোনো কোনো শরিকের। তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বিএনপি। স্থায়ী কমিটির আলোচনায় নেতারা বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের মনোমালিন্যের ফলে এটি হয়েছে। কিন্তু তারা যুগপতে সম্পৃক্ত থাকবে। এটি নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।
আগামী ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিগগির শাহাদাতবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘোষণা করবে দলটি। কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীতে ব্যাপক শোডাউনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্তও দিবসটি পালন করবেন নেতাকর্মীরা।












