ফকির শহিদুল ইসলাম,খুলনাঃ
অজপাড়া গাঁয়ের ঝরে পড়া ও বিদ্যালয় বিমুখ শিশুদের নিরালস বিদ্যা দান করেন খান মোঃ সাব্বির হোসাইন। অন্য সহকর্মীরা পেলেও গেল ছয় মাস তৃতীয় ধাপে কোনো বেতন-ভাতাই পাননি তিনি। এর আগে দ্বিতীয় ধাপে তিন মাসের বেতন ১৫ হাজার টাকা দেবার কথা থাকলেও দেয়া হয়েছিল ১০ হাজার, বাকি ৫ হাজার টাকা বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ দিতে হয় বলে কেটে রেখেছিল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। আর নিয়োগদানের এক বছর পর প্রথম ধাপে গত ৫ ডিসেম্বর ব্যাংক হিসেবে ২৫ হাজার টাকা ঢুকলেও সেখান থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ বাবদ, ১৩০০ টাকা ব্যাংক হিসাব খোলা বাবদ এবং ২৯০০ টাকা জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে দেবার কথা বলে কেটে নেয় সংস্থাটি।
গত ২ জুলাই খুলনা জেলা প্রশাসক বরাবর ‘আশ্রয় ফাউন্ডেশন’র দুর্নীতি শিরোনামে এসব লিখিত অভিযোগ করেছেন রূপসার রাজাপুর দক্ষিণপাড়া উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খান মোঃ সাব্বির হোসাইন। এমন অভিযোগ শুধু তার একার নয়। মিল্কি দেয়াড়া পশ্চিমপাড়া কেন্দ্রের শিক্ষক শেখ মোজাফ্ফর আহম্মেদ, দক্ষিণ খাজাডাঙ্গার শিক্ষক শফিকুল ইসলাম এবং কাজদিয়ার শারমিন আক্তার বৃষ্টির অনুরূপ অভিযোগ করেছেন। খুলনার ৯ উপজেলায় ১১টি ইউনিটে এক হাজার উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত এক হাজার শিক্ষক কর্মরত। কয়েকজনের সাথে কথা বললে জানা গেছে, আশ্রয় ফাউন্ডেশন পরিচালিত উপানুষ্ঠানিক শিখনকেন্দ্রে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও শিক্ষা উপকরণ প্রদানে ব্যাপক নয়-ছয়ের আদ্যোপান্ত।
ঝরে পড়া ও বিদ্যালয় বিমুখ কোমলমতি শিশুদের বিদ্যা দানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আউট অফ স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রামটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। খুলনা অঞ্চলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ‘আশ্রয় ফাউন্ডেশন’।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগপত্রে উপানুষ্ঠানিক শিখনকেন্দ্রের শিক্ষকের বেতন না পাওয়া এবং আশ্রয় ফাউন্ডেশন দুর্নীতি শিরোনামে উলেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আউট অঙ্ক স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রাম পিইডিপি-৪ এর সাবকম্পোনেন্ট ২.৫ যা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো আওতায় বাস্তবায়ন সহায়ক সংস্থা আশ্রয় ফাউন্ডেশন খুলনা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক খান মোঃ সাব্বির হোসাইন। তিনি রূপসার রাজাপুর দক্ষিণপাড়া উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। গত ২৬ জুন তৃতীয় ধাপে ৩০ হাজার টাকা অন্য সহকর্মীদের এ্যাকাউন্টে যোগ হয় কিন্তু তার এ্যাকাউন্টে ওই টাকা আসেনি। কারণ জানতে চাইলে আশ্রয় ফাউন্ডেশন থেকে তাকে বলা হয় তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে কোনো প্রকার কারণদর্শাও নোটিশ ও বরখাস্ত পত্র দেয়া হয়নি। শুধু তৃতীয়ধাপের অর্থ নয়-ছয় নয়। শুরু থেকেই সীমাহীন দুর্নীতি করছে আশ্রয় ফাউন্ডেশন। দুই বছর সবাইকে দিয়ে কাজ করিয়েছে, কিন্তু কোনো প্রকার পারিশ্রমিক দেয়নি। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি তাদের কে নিয়োগ দিয়েছিল। প্রায় এক বছর পর ৫ ডিসেম্বর তাদের প্রথম বেতন ২৫ হাজার টাকা এ্যাকাউন্টে যোগ করেছিল। কিন্তু সেখান থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ টাকা নিয়ে নেয় ঘুষ বাবদ। এ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলে নিয়োগের আগে ১৩০০ নগদ টাকা নিয়েছিল। আবার ডিসি এবং এডিসি’র ঘুষের কথা বলে ২৯০০ টাকা নগদ নিয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপে ৩ মাসের বেতন ১৫ হাজার টাকা দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয় ২ মাসের বেতন ১০ হাজার টাকা এবং ৫০০০ টাকা ঘুষ বাবদ কেটে নিয়েছিল। তৃতীয় ধাপে ৬ মাসের বেতন ৩০ হাজার টাকা অন্যদের এ্যাকাউন্টে আসলেও খান মোঃ সাব্বির হোসাইনসহ কয়েকজনের এ্যাকাউন্টে আসেনি। এ অবস্থায় আশ্রয় ফাউন্ডেশনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
কাজদিয়া উপানুষ্ঠানিক শিখনকেন্দ্রের শিক্ষকের শারমিন আক্তার বৃষ্টি বলেন, ‘প্রতিবার বেতন পেলে আশ্রয় ফাউন্ডেশনকে খুশি করতে হবে। আমি রাজি হইনি বলেই আমাদের তৃতীয় ধাপের বেতনের টাকা এ্যাকাউন্টে ঢোকেই নাই। ঈদের আগে আমার ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অর্ধেক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা দিছে- দেবার পর প্রত্যেকের কাছ থেকে ৭০০ টাকা সংগ্রহ করে অফিসে জমা দিতে নির্দেশনা দেন। এভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি ভরা আশ্রয় ফাউন্ডেশনে।’
হাজারো শিক্ষকের বেতনের অর্ধেক টাকা তুলে ওদের দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া বরাদ্দ দেখালেও শিক্ষা উপকরণও ঠিক মতো দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। বেতন-ভাতা ও শিক্ষা উপকরনের ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ মিল্কি দেয়াড়া পশ্চিমপাড়া কেন্দ্রের শিক্ষক শেখ মোজাফ্ফর আহম্মেদ, দক্ষিণ খাজাডাঙ্গার শিক্ষক শফিকুল ইসলামেরও।
এসব বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক শেখ রবিউল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে মঙ্গলবার রাতে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। আশ্রয় ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মমতাজ বেগমকে কল করলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।












