শিল্পকারখানা বন্ধ বাতিল হচ্ছে বিদেশি অর্ডার
এম আর কামাল, নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে নারায়ণগঞ্জে। বিগত কয়েক মাস ধরে গ্যাস সংকটে বিসিক শিল্প এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শীতের শুরু থেকেই গ্যাস একেবারে নেই বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থা চলমান থাকলে শিল্প-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলেও জানান তারা। একইসাথে, নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর সকল এলাকাতেই বাসাবাড়িতেও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছে গৃহিনীরা।
এদিকে গ্যাসের অভাবে নারায়ণগঞ্জের ৬ শতাধিক গ্যাস নির্ভর শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে রফতানিমুখী পোশাকখাত। বাতিল হচ্ছে বিদেশি অর্ডার। শিল্প মালিকরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এ অবস্থায় পোশাক রফতানি খাতে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, বিসিক শিল্প এলাকায় ডাইং কারখানা, স্পিনিং মিল, নীট গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৪৫০টি পোশাক শিল্প-কারখানা ও ফ্যাক্টরি রয়েছে। এসকল কারখানা থেকে বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করা হতো। কিন্তু চলমান গ্যাস সংকটের কারণে চলতি অর্থ-বছরে রপ্তানী অর্ধেকের চেয়েও নীচে নেমে আসবে বলে জানায় ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক ও আশেপাশের এলাকার শিল্প প্রতিষ্ঠানে পণ্য উৎপাদনের জন্য গ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। ডাইং কারখানা থেকে শুরু করে প্রতিটি ফ্যাক্টরীই গ্যাসের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। গ্যাস না থাকায় শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে, উৎপাদন কাজ পুরোপুরিই বন্ধ হওয়ার পথে। তারা জানান, ডাইং কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যে ফ্যাক্টরির উৎপাদন ক্ষমতা বা ডাইং ক্যাপাসিটি ৩০ টন ফ্যাব্রিকস সে উৎপাদন করছে মাত্র এক বা দুই টন।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নীটওয়ার ম্যানুফ্যাকচারার ইম্পোর্টাস এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এসময় তিনি বলেন, আমরা চিন্তা করছি গ্যাস যেহেতু নাই, তাই ফ্যাক্টরী আমরা বন্ধ ঘোষণা করবো কিনা সেটা ভাবছি। সারাদিন বসে থাকতে হয়, কোনো কাজ নাই। ফ্যাব্রিক্স নাই আমাদের, কারণ ডাইং করতে পারছি না ফ্যাব্রিক্স। ফলে কাজ নাই, শ্রমিকরা এসে বসে থাকে, তাদের তো বসিয়ে রেখে লাভ নাই। সেক্ষেত্রে আমরা ফ্যাক্টরি কিছুদিন বন্ধ রাখবো কিনা সেটা ভাবছি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের হাতে এমনিতেই অর্ডার কম, তারপরও যে অর্ডারগুলো আছে সেগুলোও আমরা সময় মতো শিপমেন্ট করতে পারছি না, টাইম ফেইল করছি। টাইম ফেইল করলে এই শিপমেন্ট এয়ারে (বিমানে) দেয়ার জন্য বায়াররা আমাদের উপর চাপ প্রয়োগ করছে। এয়ারে দেয়া মানে হচ্ছে, আমাদের টোটাল ভ্যালু (মোট মূল্য)’র অর্ধেক নাই।
গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, নারায়ণগঞ্জ জোনের পুরো গ্যাসটা তিতাস বা পেট্রোবাংলা নিয়ে ফার্টিলাইজারে (সার কারখানা) দিচ্ছে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে দিচ্ছে। ফলে নারায়ণগঞ্জ জোনে গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ থাকছে। অন্যান্য জোনে কিছু গ্যাস পাওয়া যায়, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ পুরোটাই বন্ধ। তিতাস ও পেট্রোবাংলার সাথে আমরা বহুবার কথা বলেছি, চিঠি দিয়েছি, নিজেরা গিয়ে কথা বলেছি। ওনারা আশ^স্ত করেছিলেন, প্রয়োজনে সপ্তাহে দুইদিন বন্ধ রেখে আমাদেরকে ৫টি গ্যাস সরবরাহ দিবেন। সেটাও হয়নি। তাই, সংকট চলমান থাকলে ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বিকেএমইএ এর পরিচালক ও ইস্ট কোস্ট নীটওয়ার এর স্বত্বাধিকারী শাহাদাৎ হোসেন ভুইয়া সাজনু জানান, গ্যাসের কারণে আমরা প্রচন্ড সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। বিশেষ করে গত দুই মাস যাবৎ গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। কারণ, ডাইং টা হচ্ছে পুরোটাই গ্যাসের উপর নির্ভরশীল, গ্যাসের সমস্যার কারণে কাপড়গুলো ডাইং করা যাচ্ছে না। এতে করে শিপমেন্টগুলো দেরী হয়ে যাচ্ছে, এয়ার শিপমেন্ট করতে হচ্ছে, কিছু অর্ডার আবার বাতিলও হয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের সংকট চলমান থাকলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলে মনে করেন তিনিও। তবে, আগামী মার্চ মাস থেকে গ্যাস সংকট থাকবে না বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। তিনি বলেন, মার্চ মাসের পরে গ্যাসের এই সংকট থাকবে না, ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে, সরকারের কাছ থেকে এমন আশ্বাস পেয়েছি।
এদিকে, কয়েক মাস যাবৎ গ্যাসের সংকটে ভোগান্তি পোহাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দারাও। বিশেষ করে শীতের শুরু থেকেই রান্না করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে নারীরা। আগে দিনের বেলায় গ্যাস না থাকলেও রাতের বেলায় ৩/৪ ঘন্টা গ্যাস থাকতো, যা দিয়ে রাত জেগে কষ্ট করে রান্না করতো তারা। কিন্তু এখন রাতের বেলায়ও গ্যাস থাকে না। ফলে রান্নার জন্য বিকল্প ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
হাকিম বাগ এলাকার গৃহিনী সাথী আক্তার জানান, আগে দিনে গ্যাস না আসলেও রাতে গ্যাস আসতো, রাতের বেলায় রান্না করতাম। কিন্তু গেলো কয়েকমাস যাবৎ এক ঘন্টার জন্যও গ্যাস আসে না। ইলেকট্রিক কুকারে রান্না করতে হয়। যাতে করে বিদ্যুৎ বিল আগের চেয়ে অনেক বেশী আসে।
পানির টাংকি এলাকার গৃহিনী বিথী বিশ্বাস জানান, গ্যাস নেই অনেক দিন। মাটির চুলায় লাকরি দিয়ে রান্না করছি। ছোট বাচ্চা নিয়ে রান্না করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। ধোয়ায় শিশু-বৃদ্ধসহ সকলের স্বাস্থ্যগত সমস্যা হচ্ছে।
পাক্কারোড এলাকার চাকরিজীবি রিপন মাহমুদ জানান, গ্যাস না থাকলেও প্রতি মাসে গ্যাসের বিল দিতে হচ্ছে। কিন্তু রান্না করার জন্য মাটির চুলায় লাকরি কিনতে হচ্ছে যা মাসিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নন্দীপাড়া এলাকার সেলিম বলেন, এমনিতেই আয় কমে গেছে। গ্যাস না থাকায় ১১০ টাকা লিটার হিসেবে মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকার কেরোসিন তেল কিনতে হচ্ছে। কেননা, বৃদ্ধ মা ও সন্তানদের নিয়ে খাবার তো খেতে হবে। বাড়তি এই খরচ আমার কাধে এখন মরার উপর খারার ঘা।
তিতাস গ্যাস অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের শিল্প-কারখানা ও বাসাবাড়িতে প্রতি মাসে গ্যাসের চাহিদা ৯০/৯৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। কিন্তু চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ একেবারে কম। পাশাপাশি এলএনজি মোটেও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে, শীঘ্রই এ সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে দাবি তিতাসের।
এ বিষয়ে তিতাস নারায়ণগঞ্জের ডিজিএম প্রকৌশলী মামুন আর রশীদ বলেন, বর্তমানে আমাদের জাতীয় গ্যাসে একটু সমস্যা হয়েছে। উৎপাদন কমে গেছে, এলএনজি’ও আমরা পাচ্ছি না। এই সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছে।
নারায়ণগঞ্জ জোনের সকল গ্যাস ফার্টিলাইজার বা বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। কারণ, গ্যাসের চাহিদা বিদ্যুতে লাগবে, সারে লাগবে, ইন্ডাস্ট্রিতেও লাগবে, সব জায়গায় লাগবে। গ্যাস দিয়েই তো সব হয়, কাচামাল তো গ্যাসই।
ব্যবসায়ীদের আশার বাণী শুনিয়ে তিনি বলেন, নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। ম্যানেজমেন্ট যদি সিদ্ধান্ত নেয়, নারায়ণগঞ্জ সপ্তাহে ৩ দিন চলবে, জয়দেবপুরে ৩ দিন চলবে, এভাবে যদি লোড শেয়ারিং করা হয় তাহলে একটি সমাধান আসতে পারে। এ ধরনের লোড শেয়ারিং পরিকল্পনা করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

এ ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকার বিষয়ে কি ধরনের পরিকল্পনা আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্যাস লাইনে তো আর বিদ্যুতের মতো আলাদা মিটার সিস্টেম নাই, যে শিল্প এলাকায় বন্ধ রেখে আবাসিকে দেয়া যাবে। শিল্প এলাকায় ৩ দিন দিলে আবাসিকেও ৩ দিন পাবে।
ফতুল্লার মত একই অবস্থা নারায়ণগঞ্জ শহরেও। শহরের আমলাপাড়া, গলাচিপা, দেওভোগ, বাবুরাইল, মিশনপাড়া, জামতলা, মাসদাইরের বিভিন্ন গ্যাস লাইনে সংকট দেখা দিয়েছে। রাত জেগে রান্না করছেন গৃহিণীরা। সকালের আলো ফোটার পুর্বেই রান্না করতে হচ্ছে অনেক কর্মজীবী নারীকে। সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তি বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
শহরের চেম্বার রোড এলাকার জাতীয় মিস্টান্ন ভান্ডারের মালিক বলেন, আমরা গ্যাস লাইনে রান্না করি। কিন্তু এখন গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কখনও এলপিজি গ্যাস আবার কখনও লাকড়ি চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। খরচ বাড়ছে, কিন্তু খাবারের দাম তো চাইলেই বাড়ানো যায় না। গ্যাসের সল্পতা সব কিছুর উপরে প্রভাব ফেলছে। এমনিতেই কাস্টমার কম। তার উপর লাভের খাতা সংকুচিত হচ্ছে দিনে দিনে। গ্যাসের সংকট চলতে থাকলে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
গ্যাস সংকট শুধু রান্নার কাজেই সীমাবদ্ধ তা নয়। শিল্প কারখানাতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেল, এলপিজি ব্যবহার করে শিল্প কারখানার উৎপাদন চালিয়ে রাখছেন কারখানা মালিকরা। কেঁউ কেঁউ একটি কারখানার একাধিক সেকশন অফ করে দিয়েছেন। ছাঁটাই করছেন শ্রমিক কিংবা বেতন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়ে চতুর্মুখী চাপ তৈরী হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট ও গ্যাসের সল্পতা নিয়ে।
ধারাবাহিক গ্যাস সংকটে বরাবরই প্রতিবাদী ভুমিকা পালন করে আসছে সামাজিক সংগঠন আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি সহ একাধিক সংগঠন। এবার গ্যাস সমাধানের দাবীতে আগামীকাল সোমবার নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচী ডাক দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি। এদিন গ্যাসের দাবীতে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করবেন তারা। এর আগেও একাধিকবার তিতাস গ্যাস কার্যালয়ের সামনে ঝাড়ু মিছিল, ঘেরাও কর্মসূচী পালিত হয়েছে। কিন্তু সমাধান আসে সাময়িক সময়ের জন্য। স্থায়ী সমাধানের বদলে দফায় দফায় বাড়ে গ্যাসের দাম। যা নিয়ে বরাবরই ক্ষুব্ধ ভোক্তা মহল।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, শীতকালে গ্যাস সমস্যা বরাবরই ঘটে আসছে। চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এই সংকট দেখা দিচ্ছে। সংকট কেবল নারায়ণগঞ্জেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানী ঢাকাতেও একই ভাবে সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পেলেই সমাধান হবে এই সংকটের।
ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরীর রফতানিমুখী কয়েকটি ডাইং কারখানা ঘুরে দেখা যায়, বিদেশি বায়ারদের অর্ডার পূরণ করতে উৎপাদনের চাপে শ্রমিকরা যেখানে দম ফেলার সময় পেতেন না, গ্যাসের অভাবে মেশিন বন্ধ থাকায় এখন তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। নষ্ট হচ্ছে গুদামে মজুতকৃত কোটি কোটি টাকার কাপড়। নারায়ণগঞ্জে গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ শিল্প কারখানায় একই অবস্থা। গত এক মাস ধরে নারায়ণগঞ্জের ডাইংসহ অন্য শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। যে কারখানায় প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মেট্রিক টন উৎপাদন হতো, এখন সেখানে এক টনও উৎপাদন হচ্ছে না। কবে গ্যাস আসবে এনিয়ে নানা দুশ্চিন্তায় শ্রমিক কর্মচারীরা। ক্রোনি গ্রæপের প্রতিষ্ঠান অবন্তি কালার কারখানায় গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আহসান হাবীব বলেন, আমাদের দুইটি ফ্যাক্টরিতে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত আছেন ১২ হাজার শ্রমিক। গ্যাসের প্রেসার মিনিমাম পাঁচ পিএসআই (চাপের একক) হলে আমাদের প্রোডাকশন স্মুথলি হয়। তবে গত দুই মাস ধরে আমরা পাচ্ছি এক থেকে দুই পিএসআই। এর মধ্যে গত এক মাস ধরে গ্যাসের প্রেসার শূন্য পিএসআই নেমে এসেছে। ফলে দিনে রাতে কোনোভাবেই মেশিন চলছে না। সব সেক্টরে প্রোডাকশন বন্ধ রয়েছে। আমাদের পুরো উৎপাদন কাজই বন্ধ রয়েছে। শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আমাদের পুরো টেক্সটাইলে প্রতিদিন কমপক্ষে চল্লিশ টন প্রাডাকশন লস হচ্ছে। ফেব্রিক্স ডাইংয়ে প্রতিদিন বিশ টন, ইয়ার্ন ডাইংয়ে ডেইলি দশ টন, অল ওভার প্রিন্টিংয়ে ডেইলি দশ টন প্রোডাকশন ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ডেইলি কোটি টাকা লস হলে আমাদের মালিক বেতন দেবে কোথা থেকে? এই নিয়ে সবাই খুব হতাশায় রয়েছে। বায়ারদের সঙ্গে আমাদের কাজ শিফট করতে পারছি না। শিপমেন্ট ডিলে হচ্ছে। কোনো কোনো বায়ারের শিপমেন্ট বাতিলও হয়েছে। আর ডাইং বন্ধ থাকায় বিরাট প্রভাব পড়েছে রফতানিমুখী পোশাকখাতে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক কারখানায় বিদেশি বায়ারদের অর্ডারও বাতিল হচ্ছে। পোশাক রফতানিকারক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অভিযোগ, সরকার গ্যাসের দাম তিন গুণ বাড়ালেও শর্ত অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারছে না।
ক্রোনি গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ আসলাম সানি বলেন, আমার দুইটা ফ্যাক্টরি টোটালি বন্ধ। একটা ফ্যাক্টরিতে কয়েক গুণ খরচ দিয়ে তেল ও এলএনজি কিনে এনে চালাচ্ছি। আরেকটা ফ্যাক্টরি চালাতে পারছি না। আমাদের কথা হলো ভেরি নরমাল। সরকার যখন এলএনজির দাম, গ্যাসের দাম তিনগুণ বৃদ্ধি করলো, তখন একটা কমিটমেন্ট ছিল আমাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেবে। আমরা ব্যবসায়ীরা বলেছিলাম দাম দিতে রাজি আছি, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে। আজকে দাম বৃদ্ধির পরেও আমরা গ্যাস পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো রুগ্ন হয়ে যাচ্ছে। বায়ারদের সঙ্গে কমিটমেন্টগুলো রাখতে পারছি না। আমাদের শিপমেন্টের মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। এখন আমরা টোয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্টও ফ্যাক্টরি চালাতে পারছি না। শিপমেন্টের বাকি মালগুলো ক্যানসেল হচ্ছে। ব্যাংকের পেমেন্ট দিতে পারব না। এয়ার শিপমেন্ট হচ্ছে না। যে পরিমাণ অর্থ লোকসান আমরা করছি, আমরা সাত বছরেও এ ক্ষতি পোষাতে পারব না।
এই শিল্প মালিক আরও বলেন, ‘আমরা মারাত্মকভাবে লসের সম্মুখীন হচ্ছি। শ্রমিকদের কাজ নাই। মাস শেষে তাদের বেতন দিতে হবে। গ্যাস না পেয়েও আমাকে গ্যাস বিল দিতে হবে। বাতাসের গ্যাস বিলও দিতে হবে। থ্রি হান্ড্রেড পার্সেন্ট বৃদ্ধি রেটে বিল দিতে হবে। এটা অমানবিক। এ ব্যাপারে আমরা সরকারকে বার বার বলছি। বিকেএমইএ কথা বলছে। কেউ শুনছে না বা আমাদের প্রবেলেমটা কারও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। ওভার অল এই লস বেয়ার করার ক্ষমতা আমাদের নাই। এ পরিস্থিতিতে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নাই।
জেলা কলকারখানা অধিদফতর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে গ্যাসনির্ভর ছয় শতাধিক শিল্প কারখানার মধ্যে চার শতাধিক ডাইং কারখানা, অর্ধশতাধিক রি-রোলিং ও স্টিল মিল, ৩৫টি চুন কারখানা, ৮টি সিমেন্ট কারখানা এবং ১০টি অটো সল্ট মিল রয়েছে।

