মাগুরা প্রতিনিধি
ছবিঃ প্রতিনিধি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মাগুরায় শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে আয়োজন ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। পরিবেশিত হয় নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য। তবে আয়োজনের তুলনায় দর্শক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অধিকাংশ দর্শক ছিলেন নার্সিং ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষার্থী। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ দর্শকের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত।
এ নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—জেলায় যেখানে অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, সেখানে জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনেও কেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অংশগ্রহণ এত কম?
জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে জেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন (পিপিএম-সেবা), সিভিল সার্জন ডা. মো. শামীম কবির এবং সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. আলফাজ উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ইমতিয়াজ হোসেন।
জেলা কালচারাল অফিসার পার্থ প্রতিম দাস জানান, প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি সারাদেশে একযোগে ‘নজরুল বর্ষ’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। এর অংশ হিসেবে মাগুরায় তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতাসহ নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরবর্তীতে বছরব্যাপী কর্মশালা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, নাটক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলবে।
দর্শক উপস্থিতি কম হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে আকাশ সংস্কৃতি, মোবাইলনির্ভর বিনোদন এবং প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণার কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, জেলার প্রায় ৫০টি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে অনুদানপ্রাপ্ত ৩২টিসহ সব সংগঠনকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে এবং লিখিতভাবে অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপরও প্রত্যাশিত সংখ্যক দর্শক উপস্থিত হননি।
পার্থ প্রতিম দাস বলেন, আমরা অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারি, সবাইকে জানাতে পারি। কিন্তু ঘর থেকে বের হয়ে অনুষ্ঠানে আসার মানসিকতা একজন সংস্কৃতিসেবীকেই তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনুষ্ঠানের মান আরও উন্নত করার সুযোগ অবশ্যই আছে। তবে দর্শককেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।
তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতিমুখী করে তুলতেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠানে আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, এই বয়স থেকেই যদি তাদের মধ্যে নজরুলচর্চা ও সাংস্কৃতিক অনুরাগ তৈরি করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা নিয়মিত দর্শক ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে গড়ে উঠবে।
তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মীর মতে, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সংস্কৃতিমনা মানুষ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আয়োজনটি আরও প্রাণবন্ত হতে পারত।
এদিকে সম্প্রতি জেলা পর্যায়ে প্রায় ৮০ জন শিল্পীকে সরকারি অনুদানের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার ৩২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিত সরকারি অনুদান পাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর মতো একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজনে সেই শিল্পী ও সংগঠনগুলোর বড় অংশের দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না বলেই মনে করেছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই। তাদের মতে, অনুদানপ্রাপ্ত শিল্পী ও সংগঠনের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলে দর্শক সংখ্যা যেমন বাড়ত, তেমনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা যেত।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জেলা কালচারাল অফিসার পার্থ প্রতিম দাস বলেন, অনুদানপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ অবশ্যই প্রত্যাশিত। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় তাদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু সব সংগঠন থেকে প্রত্যাশিত উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ভবিষ্যতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশের মতে, দর্শক সংকটের পেছনে কেবল মানুষের অনাগ্রহ নয়, প্রচার-প্রচারণার কার্যকারিতা, অনুষ্ঠান আয়োজনের ধরণ, সময় নির্বাচন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সংগঠন ও শিল্পীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে জেলার সাংস্কৃতিক পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
তিন দিনব্যাপী উদ্বোধনী কর্মসূচি শেষে বছরজুড়ে বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার, নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের পরিকল্পনা রয়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমির। সংশ্লিষ্টদের আশা, আগামী আয়োজনগুলোতে স্থানীয় দর্শক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও অনুদানপ্রাপ্ত শিল্পীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।












