সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব তালুকদার মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। বুধবার (২৪ আগস্ট) দুপুর একটার দিকে তার মৃত্যু হয়েছে।
২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মাহবুব তালুকদারকে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কর্তৃক নিয়োগ পান।
ইসির সবচেয়ে আলোচিত কমিশনার ছিলেন মাহবুব তালুকদার। ভোট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দেয়া তার বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বিভিন্ন সময়ে সে বক্তব্যের সমালোচনা করেন সিইসি নুরুল হুদা। কমিশনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আলাদা লিখিত বক্তব্য পড়তেন মাহবুব তালুকদার। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি নুরুল হুদা কমিশনের বিদায়ের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে গেছেন এ কমিশনার।
পাঁচ বছর দায়িত্বের শেষ দিনে এসে মাহবুব তালুকদারের মূল্যায়ন হলো নির্বাচনে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রের লাশ পড়ে গেছে। একই দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নিজেদের সফল দাবি করে বলেছেন, তাদের কিছু ছোটোখাটো ভুল থাকতে পারে। গোটা পাঁচ বছর সিইসির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো মাহবুব তালুকদারের মূল্যায়ন ছিল একেবারে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো।
বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে মাহবুব বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, ওই নির্বাচনে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্রের লাশ পড়ে আছে। এই লাশ সৎকারের দায়িত্ব কে নেবে?’
কথাটা রূপকার্থে বলার কথা জানিয়ে মাহবুব বলেন, ‘এটাই সত্য। নির্বাচনের নামে সারা দেশে এমন অরাজকতা কখনও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। তৃণমূল পর্যায়ে এই নির্বাচন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। অন্য দিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পদে আসীন হওয়া নির্বাচন বলা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।’
মাহবুব তালুকদার ১৯৪২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার দেশের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলায়। তিনি ঢাকা নবাবপুর হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন।
১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ও মুজিবনগন সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের চাকুরিতে যোগ দেন। এ সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৪ শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাকে উপসচিবের পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির স্পেশাল অফিসার নিযুক্ত করেন।
রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর সময়ে তিনি তার পাবলিক রিলেশনস্ অফিসার ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জনাব তালুকদার তার সহকারি প্রেস সচিব (উপসচিব) এর দায়িত্ব পালন করেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাকে তদানিন্তন ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা পরবর্তীকালে বিসিএস প্রশাসন হিসেবে রূপান্তরিত হয়। একসময়ে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। চাকুরি জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিবের পদে কর্মরত ছিলেন।
মাহবুব তালুকদার একজন বিশিষ্ট সৃজনশীল লেখক। কবিতা, গল্প, উপন্যস, স্মৃতিকথা, ভ্রমনকাহিনী মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা চল্লিশ। তিনি ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরষ্কার লাভ করেন। তার স্ত্রীর নাম নীলুফার বেগম। এই দম্পতির দুই কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। মাহবুব তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার ভুগছিলেন।












