জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
সরকার গঠনের ছয় মাস না পেরোতেই মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং নতুন মুখ যুক্ত করার মধ্য দিয়ে সরকারের দ্বিতীয় ধাপের কাজের কৌশলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। গত শুক্রবার ছয়জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পরই সামনে এসেছে এই পুনর্বিন্যাসের নানা দিক। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব নেওয়ায় শূন্য হওয়া স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম, পররাষ্ট্র, ধর্ম, খাদ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়েও এসেছে পরিবর্তন।
সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই শূন্য পদ পূরণ, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং নতুন মুখ যুক্ত করা হয়েছে।
জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা ও প্রচার কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
স্থানীয় সরকারে আবদুল মঈন খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হুমায়ুন কবির, ধর্মে শামীম কায়সার লিংকন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাচিং প্রু জেরীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে- যা সরকারের দ্বিতীয় ধাপের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন নির্দেশ করছে।
তবে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে। জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে। স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের অনেকেই মনে করেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, প্রচার কৌশল ও সরকারি অর্জন তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। নতুন এ নিয়োগকে তারই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন তাদের অনেকেই। একই সঙ্গে সরকারি গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সরকারের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রত্যাশাও ব্যাপকভাবে তৈরি হয়েছিল সাবেক তথ্যমন্ত্রীকে ঘিরে। ফলে এবারের রদবদল শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, সরকারের কাজের ধরন ও অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের বার্তাও দিচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদটি শূন্য হয়। সেই শূন্যতা পূরণে বিএনপির সিনিয়র নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্ব আনার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রিসভায় রদবদলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচনায় এসেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। জহির উদ্দিন স্বপনকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, এ পরিবর্তনকে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের প্রথম ছয় মাসে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, সরকারি প্রচার কৌশল এবং সরকারের অর্জন দেশীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আরও জোরালো ভূমিকা সম্প্রসারণের প্রয়োজন ছিল।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জনগুলো নিয়ে সমন্বিত মিডিয়া কৌশলের অভাব দেখা গেছে বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একাংশ।
সরকারি গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। পুরোনো কাঠামো ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে বিএনপির মধ্যে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সাবেক তথ্যমন্ত্রীর আশপাশের ব্যক্তিদের নামে অভিযোগ জমা পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয়ে।
সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা কিছু ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে মন্ত্রীর অনুসারীরা বলছেন, সরানোর বিষয়টি নিয়ে তারা এখনো অন্ধকারে। মন্ত্রী বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তার অনুসারীরা।
এ অবস্থায় শরিক দল বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়াকে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সরকারের মিডিয়া কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। সরকারের নীতি ও অর্জন আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নতুন মন্ত্রীকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হতে পারে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাকে পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আফরোজা খানম রিতাকে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তার দায়িত্ব পরিবর্তনের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১ জুন পদত্যাগ করেন। ফলে শূন্য হওয়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সাচিং প্রু জেরী। পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসন, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নতুন মন্ত্রীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হুমায়ুন কবিরকে নতুন প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের কাজে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ায় এক প্রতিমন্ত্রীর ওপর মন্ত্রণালয়ের কাজের চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি গত ছয় মাসে মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি ও ব্যস্ততা বেড়েছে। নতুন উইং চালু, অভিবাসন ও অবৈধ অভিবাসন বন্ধে উদ্যোগ এবং প্রবাসী কল্যাণ, সংস্কৃতি, শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আন্তমন্ত্রণালয় ফোকাল পয়েন্ট কমিটি গঠনের মতো কাজ সামনে এসেছে। নতুন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়ায় এই বাড়তি কাজ সামলানো সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই মন্ত্রণালয়ে এখন একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন মোহাম্মাদ শামীম কায়সার লিংকন। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয়তা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান ও ভাতা, ইসলামী ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার মতো বিষয় সামনে থাকায় এই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বও বেড়েছে। বিশেষ করে সরকার চায় না, ধর্মীয় কোনো উত্তেজনা। এমন অবস্থা বিবেচনা করে একজন মন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামীমকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেন, সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এক মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী থাকা অপচয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় বেশি ব্যক্তি না থাকাই ভালো।
সব মিলিয়ে এবারের রদবদল শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সরকার ছয় মাসের অভিজ্ঞতা থেকে দ্বিতীয় ধাপের কাজের কৌশল সাজাচ্ছে। এখন এই পরিবর্তন বাস্তবে সরকারের প্রশাসনিক গতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় কতটা প্রভাব ফেলে সেদিকেই নজর থাকবে।












