• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • khoborsheersha@gmail.com
  • +44 (7444) 088415

রোহিঙ্গাসংকটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা

প্রকাশ: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৪৫
আপডেট: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৪৫

রোহিঙ্গাসংকটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

অলংকরণ: মেহেদী হাসান

প্রায় ৯ বছর ধরে বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের ভার বহন করছে, যার সৃজন তার নিজস্ব নয়। রোহিঙ্গাসংকটের মানবিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন করেছে ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সংকটটির স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এটি এখন কেবল মানবিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? ২০১৭ সালের আগস্টে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে কয়েক মাসের মধ্যেই ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করলে বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অবস্থান করছে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। মানবিক বিবেচনায় এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। তবে এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান যে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের প্রভাব। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা বলে, বছরের পর বছর ধরে শরণার্থী জনগোষ্ঠী অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলে সেখানে অপরাধ, চোরাচালান, উগ্রপন্থা এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরকে কেন্দ্র করে মাদক পাচার, মানবপাচার, অপহরণ, অস্ত্র চোরাচালান ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিনিয়ত এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি–কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো অন্যায় হবে। অধিকাংশ রোহিঙ্গাই শান্তিপ্রিয় এবং নিজেদের দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই নিরাপত্তা ঝুঁকির উৎস হিসেবে সংকটের দীর্ঘায়নকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টিও এ সংকটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীল এলাকা। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সীমান্তপথে মাদক ও মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নতুন কোনো সহিংসতা বা বাস্তুচ্যুতি ঘটলে বাংলাদেশকে আবারও নতুন চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। রোহিঙ্গা সংকটের সামাজিক প্রভাবও গভীর। কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ বহন করছে। স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ এবং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্থানীয় মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রেও চাপ বেড়েছে। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে তা বৃহত্তর নিরাপত্তা সমস্যার জন্ম দিতে পারে। পরিবেশগত ক্ষতি এই সংকটের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক। শিবির স্থাপনের জন্য বিপুল পরিমাণ বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য এই পরিবেশগত চাপ কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকির অংশ। কারণ পরিবেশের অবনতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অতীতে এর বহু উদাহরণ রয়েছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও রোহিঙ্গা সংকট একটি বড় বাস্তবতা। খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের কারণে দাতাগোষ্ঠীর মনোযোগ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এটি একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রজন্মগত অনিশ্চয়তা। শিবিরে বেড়ে ওঠা হাজার হাজার শিশু ও কিশোর-কিশোরী এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বড় হচ্ছে, যেখানে তাদের সামনে কোনো স্পষ্ট ভবিষ্যৎ নেই। তারা মায়ানমারের নাগরিক নয়, আবার বাংলাদেশেরও নাগরিক নয়। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সীমিত সুযোগ নিয়ে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম ভবিষ্যতে হতাশা ও বঞ্চনার শিকার হতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও হতাশা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। রোহিঙ্গা সংকটও সেই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় ও কৌশলী হতে হবে, যাতে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের আলোচনায় থাকে এবং এর কার্যকর সমাধানের পথ সুগম হয়। সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতিহীনতা। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি হলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফিরতে চায় না। অন্যদিকে মায়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। ফলে সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের পথ। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মানবিক দায়িত্ব ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। রোহিঙ্গারা একটি নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী; তাদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, শিবির ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বৃদ্ধি, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকট আজ আর শুধু কক্সবাজারের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রশ্ন। সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এর বহুমাত্রিক প্রভাব তত গভীর হবে। তাই প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা, মায়ানমারের ওপর বাস্তব চাপ সৃষ্টি এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ সুগম করা। বাংলাদেশ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন প্রয়োজন সেই মানবিকতার ন্যায্য মূল্যায়ন এবং সংকটের টেকসই সমাধান। কারণ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের জন্য নয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের স্বার্থেও অপরিহার্য।

লেখক: শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
bappaditty.chowdhury2005@gmail.com


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ

 

[interactive_divitional_maps_bd]

সম্পাদক: আব্দুল আজিজ । প্রকাশকঃ সায়েক এম রহমান তালুকদার ।
প্রকাশকঃ রাশেদুর রহমান (রাকেশ) । প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

রাজশাহী অফিস: রুম-১৪০৫(লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: khoborsheersha@gmail.com, মোবাইল: +44 (7444) 088415