গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। কিন্তু এই স্বাধীনতা কখনোই বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্তদের পক্ষে জনমত তৈরির প্রচেষ্টা বা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার হাতিয়ার হতে পারে না। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে যে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রাণহানির অভিযোগ উঠে এসেছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।
দুঃখজনকভাবে, জনপরিসরে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে যে, দেশের কিছু গণমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোতে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা অতীতের স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অনুষ্ঠানে নিয়মিতভাবে এমন অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যারা অভিযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন বা তাদের কর্মকাণ্ডকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব; তাই এগুলোর স্বচ্ছ, স্বাধীন ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা সত্য অনুসন্ধান, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণকে নির্ভুল তথ্য প্রদান করা। যদি কোনো গণমাধ্যম, উপস্থাপক, প্রযোজক বা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তবে প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইভাবে, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তাঁরা অর্থ বা অন্য কোনো স্বার্থে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের ভূমিকাও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
এ প্রেক্ষাপটে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও জনপরিসরে প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রশ্নের সর্বোত্তম উত্তর হতে পারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনানুগ পদক্ষেপ। কোনো অভিযোগকে উপেক্ষা না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা এবং ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
গণতন্ত্র টিকে থাকে সত্য, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির ওপর। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা ক্ষমতার কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগের ভিত্তিতেই দোষী ধরে নেওয়াও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তাই একদিকে যেমন অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতাও সমানভাবে বজায় রাখতে হবে।
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে অপপ্রচার, দায়মুক্তি এবং বিচারকে প্রভাবিত করার সব ধরনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আইনসম্মত ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।
ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ












