• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণ নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জামায়াতের

প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৩১
আপডেট: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৩১

9652187

জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণ নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জামায়াতের

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি:সংগৃহীত
সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ কোনো সংস্কার নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থার পরিবর্তে বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপের বিষয়ে দলের পর্যবেক্ষণ ও অবস্থান তুলে ধরে এসব কথা বলেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নতুন নীতিমালার আওতায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগকে তিনি ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এটি সংস্কার নয়, এটি হাতবদল। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরির আশঙ্কা :

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বক্তব্যে বলা হয়, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধা, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। এসব অবকাঠামোগত সক্ষমতা দেশে সীমিতসংখ্যক বড় গোষ্ঠীর হাতে থাকায় বেসরকারিকরণের নামে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি না হয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে যদি বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হয়, তাহলে সেখানে জনগণের নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় জবাবদিহি ও কার্যকর নিরীক্ষার সুযোগ কমে যেতে পারে।

বিপিসিকে লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন :

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) অদক্ষ বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার যুক্তি যথেষ্ট নয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের মুখে ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।

চলমান জ্বালানি সংকটকে বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক লোকসান বহন করতে হলেও জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

দরপত্রের সময়সীমা কমানো নিয়েও প্রশ্ন :

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ২৬ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিনে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংকটকালে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হচ্ছে না। তবে দরপত্রের সময়সীমা এতটা কমিয়ে দিলে আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে এবং প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজার নিয়ে উদ্বেগ :

জ্বালানি তেলকে শুধু সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তা, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিমান চলাচলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জ্বালানি তেলের বাজারের আকার বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হলে প্রতি লিটারে সামান্য অতিরিক্ত মুনাফাও বছরে বিপুল অর্থে পরিণত হতে পারে।

এ ছাড়া দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র কীভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেবে এবং প্রত্যন্ত চর, হাওর ও পাহাড়ি এলাকায় অলাভজনক হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ কে করবে—এমন প্রশ্নও তোলা হয়।

শ্রমিকদের অধিকার নিয়েও উদ্বেগ :

জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের অধিকার ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

এ ধরনের উদ্যোগ জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে কথা বলা শ্রমিকদের আইনগত সুরক্ষা দুর্বল করার প্রচেষ্টা হতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়।

সরকারের কাছে ৭ প্রশ্ন :
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে রয়েছে—

১. বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের খসড়া নীতিমালা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন আছে কি না।
২. খসড়া নীতিমালা থাকলে তা অবিলম্বে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে কি না।
৩. কোন সমীক্ষা ও খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই সমীক্ষা প্রকাশ করা হবে কি না।
৪. কোন কোন কোম্পানি এ বিষয়ে আবেদন বা প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের নাম প্রকাশ করা হবে কি না।
৫. জ্বালানি তেল আমদানির দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে ১০ দিনে কমানোর কারিগরি ভিত্তি কী এবং এতে দরদাতার সংখ্যা কমেছে কি না।
৬. বেসরকারি আমদানিকারক এলে ভোক্তা পর্যায়ের জ্বালানি তেলের দাম কে নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নাকি সংশ্লিষ্ট কোম্পানি।
৭. আগের সরকারের আমলে যেসব বেসরকারি কোম্পানিকে জ্বালানি তেল বিপণনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেসব সিদ্ধান্তের পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে কি না।

বিশেষজ্ঞদের মতামতের উল্লেখ :

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিষয়টি শুধু জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা সংগঠনের বক্তব্যেও জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্যের উল্লেখ করে বলা হয়, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটি সাধারণ মুনাফাভিত্তিক পণ্যের মতো পরিচালনা করা উচিত নয় এবং সীমিত মুনাফার মধ্যে সরকারের অধীনে পরিচালনাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

এ ছাড়া কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের বক্তব্য উল্লেখ করে জ্বালানি খাতে কোম্পানিগুলোর মুনাফা, রাষ্ট্রের রাজস্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানার মূল্যায়নের উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশে জ্বালানি খাতকে বেসরকারি ব্যবস্থায় নেওয়ার সময় এখনো আসেনি এবং এলপিজি খাতে বেসরকারিকরণের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী সরকারের প্রতি জ্বালানি খাতের যেকোনো বড় নীতিগত পরিবর্তনের আগে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা, জনস্বার্থ, স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানায়।

এতে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম,সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহি পরিষদ সদস্য আব্দুর রব, শাহাবুদ্দিন, ড.মু.রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার।


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com