নেতৃত্বের দীর্ঘ সংকট
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে—এটি আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য সত্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাঁর শাসনামল বিশ্লেষণ করলে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন সামনে আসে। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও তৎকালীন অর্থনৈতিক বিপর্যয় মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনও গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে গুরুতর বিতর্কের জন্ম দেয়।
এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসে সামরিক শাসনের অধ্যায়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ থাকলেও তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ সামরিক শাসন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উন্নয়নের কিছু দৃষ্টান্ত থাকলেও একটি দেশের নেতৃত্বের মূল্যায়ন শুধু কিছু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে করা যায় না; গণতন্ত্র, জবাবদিহি, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আমলে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও কিছু অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, দলীয়করণ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ফলে তাঁকেও নিখুঁত দক্ষতা ও দেশপ্রেমের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর সরকারের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিভিন্ন সামাজিক সূচকে অগ্রগতির দাবি রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নির্বাচনব্যবস্থা, বিরোধী দলের ওপর চাপ, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ নিয়ে দেশ-বিদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে উন্নয়নের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির দুর্বলতাও এই সময়ের মূল্যায়নে বিবেচনা করতে হয়।
অর্থাৎ, বিভিন্ন সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয় আমাদের বারবার ভাবায়—বাংলাদেশ কি এমন নেতৃত্ব পেয়েছে, যেখানে দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম একই সঙ্গে প্রাধান্য পেয়েছে?












