• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মক্কা জোটে যুক্ত হলে অর্থনীতি-কূটনীতিতে কতটুকু লাভ

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৫৯
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৫৯

মক্কা জোটে যুক্ত হলে অর্থনীতি-কূটনীতিতে কতটুকু লাভ

মক্কা জোটে যুক্ত হলে অর্থনীতি-কূটনীতিতে কতটুকু লাভ

শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, গাজা যুদ্ধ, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট এবং ওয়াশিংটনের নীতির অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গত ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে ‘মক্কা প্যাক্ট’ বলা হচ্ছে।

গত ৩১ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুলে চুক্তির আওতায় গঠিত কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, জোটটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ (মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স) রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সরকারি পাঠ প্রকাশিত না হওয়ায় এর প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যদেশের ওপর হামলা হলে তা অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ কারণে কেউ কেউ এটিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এই তুলনা সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। ন্যাটোর মতো স্থায়ী কমান্ড কাঠামো, নির্দিষ্ট সেনা মোতায়েন ব্যবস্থা বা বাধ্যতামূলক সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিধান এই চুক্তিতে আছে কি না, তা জানা যায়নি।

তবে ইস্তাম্বুল বৈঠকে জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জোটের একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রথম মহাসচিব হিসেবে তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধি।

ফিদান আরও জানান, জোটটি অঞ্চলের অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা হ্রাস করবে এবং এটি শান্তির চাবিকাঠি হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি কাজ করবে।

চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দিন পর, ৯ আগস্ট, ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের জাজান এলাকায় আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলা চালায় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে বলেছেন, সদস্যদেশগুলো বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, এই জোটে যোগদানে বাংলাদেশ কোনো ঝুঁকি দেখছে না। তবে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ও সদস্যপদের শর্ত প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি। ফলে বিষয়টি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইস্তাম্বুল বৈঠকের পর জানিয়েছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে আরও ছয় থেকে সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যোগ দিতে আগ্রহী। আগ্রহী অন্য দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তি সহজ করতে কর্মকর্তারা একটি খসড়া চুক্তির কাঠামো নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশকে এই জোটে যোগদানে আগ্রহ দেখানো সর্বশেষ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা হাজির করেছে
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা হাজির করেছেফাইল ছবি
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সুবিধার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র সৌদি আরবের শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে যান। তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি সৌদি আরবে গেছেন (বাসস, ২০২৬)।

সৌদি আরবের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন খাত উন্মুক্ত করা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, চুক্তিভঙ্গ রোধ, মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী কর্মীদের আইনি সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে রিয়াদের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা সম্ভব হতে পারে। তবে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হলেই এসব সুবিধা নিশ্চিত হবে না। এর জন্য পৃথক শ্রমচুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং কার্যকর কনস্যুলার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন

তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা মূলত প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও শিল্পে। ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌপ্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে তুরস্কের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইস্তাম্বুলের বৈঠকে তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আন্তকার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং যৌথ উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়নসহ প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে শুধু সরঞ্জাম কেনার দিকে না গিয়ে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা তৈরিকে গুরুত্ব দিতে পারে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আর পাকিস্তানের রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান। এই তিন দেশের সঙ্গে একই কাঠামোয় কাজ করার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করতে পারে।

মক্কা প্যাক্টের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বেগও কাজ করছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অধ্যয়ন বিভাগের সিনিয়র ফেলো স্টিভেন এ কুকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু তার নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়েছে। ইরাক যুদ্ধ, সিরিয়া ও ইয়েমেনে সীমিত ভূমিকা, ২০১৯ সালের হামলার পর সৌদি আরবকে প্রত্যাশিতভাবে রক্ষা না করা এবং গাজা যুদ্ধকে ঘিরে নীতির অস্পষ্টতা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে। ফলে তারা নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব, তুরস্কের রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের দক্ষিণ এশীয় অবস্থান একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে ঢাকার যোগাযোগের পরিসর বাড়বে।

ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো নিরাপত্তাকাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে নয়াদিল্লি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণের আলোকে মূল্যায়ন করতে পারে। এতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সহযোগিতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকট তৈরি হবে—এমন নয়; বরং ঢাকার অবস্থান, চুক্তির শর্ত এবং এর বাস্তব প্রয়োগই ভারতের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা নিজে থেকেই ভারতবিরোধী পদক্ষেপ নয়। বাংলাদেশের উচিত প্রতিটি সম্পর্ককে পৃথক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা এবং কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে পক্ষভুক্ত না করা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সামরিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। কোনো সদস্যদেশের সংঘাতে বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা দিতে হবে কি না, চুক্তির ভৌগোলিক সীমা কোথায়, সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং বাংলাদেশ আপত্তি জানাতে পারবে কি না, এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নয়, তবে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। পৃথক চুক্তি, দক্ষ কূটনীতি এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের লাভ নির্ভর করবে জোটে যোগ দেওয়ার ওপর নয়, বরং কী শর্তে যোগ দিচ্ছে, সামরিক দায়বদ্ধতা কতটা সীমিত রাখতে পারছে এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধাগুলোকে বাস্তব চুক্তিতে রূপ দিতে পারছে কি না, তার ওপর।
আ/আ


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com