• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মে দিবস ও নারী শ্রমিকের অধিকার

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৩:২০
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৩:২০

96007

মে দিবস ও নারী শ্রমিকের অধিকার

মিতা রহমান
১ মে, মে মাসের প্রথম দিন। যা মহান ‘মে দিবস’ হিসাবে বিশ্বে পরিচিত। বঞ্চিত, লাঞ্ছিত এবং অধিকারহারা শ্রমজীবী জনগণের অধিকার ও দাবি আদায়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে মে মাসের প্রথম দিনটি সারা বিশ্বে সব দেশের শ্রমিকরা পালন করে থাকে। এই দিনটিতে শ্রমিকরা কেবল নিজ দেশেই নয়, বিশ্বের সব দেশের শ্রমিকদের প্রতি সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি প্রকাশ করে থাকেন। মিছিল, সভা, সমাবেশ ব্যানার-ফেস্টুনে কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয় ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। শ্রমিকশ্রেণির কাছে মহান মে দিবসটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হলেও এই দিবসে পৃথিবীর নিপীড়িত শ্রমিকরা নব নব সংগ্রামের শপথ গ্রহণ করে থাকেন।

মে দিবস, শ্রমিকদের দাবী আদায়ের বিজয়ের দিন হলেও এই দিনে এখনও বিজয় থেকে বঞ্চিত নারী শ্রমিকরা। বর্তমানে পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে নারী শ্রমিকের কদর অনেক বেশী হলেও বৈষম্যে থেকে তারা রেহাই পায় নি। নারী শ্রমিক হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর ন্যায্য মজুরী থেকে বঞ্চিত হয়ে অতি কষ্ঠে জীবন যাপন করে থাকে। ধান লাগানো, ধান কাটা, ধান মাড়াই, মাটি কাটা, হোটেল, রাইচ মিল, চাতাল, বিড়ি ফ্যাক্টরী, ইট ভাটা, রাজ মিস্ত্রীর জোগালী, পাথর ভাঙ্গার কাজসহ সব রকম ভারী কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরা কাজ করলেও নারীরা ন্যায্য মজুরী পায় না বললেই চলে। অভাবের তাড়নায় কাজ করা নারীদের হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়। বিনিময়ে মালিকরা যা দেয় তা দিয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হয়। যদি কেউ মজুরী নিয়ে প্রতিবাদ করে তবে তাদের কাজ থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়ে থাকে।

পুরুষ শ্রমিক যেখানে একই কাজ করে পায় ৫০০/৬০০টাকা সেখানে নারী শ্রমিকরা পায় ৩০০/৩৫০ টাকা। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের যে দাম মালিক যে টাকা দেয়, তাতে কিছুই হয় না। যা পায় তাই দিয়ে কোন মতে বেঁচে থাকে তারা খেয়ে না খেয়ে। প্রতিবছর শ্রমিক দিবস, নারী দিসব পালিত হয়, সকল কাজে নারী পুরুষ সম-অধিকারের কথা বলা হয়। কিন্তু ন্যায্য মজুরীর ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এ বৈষম্য দূর হলে দেশের অর্থনীতি একধাপ এগিয়ে যাবে বলে বিজ্ঞজনরা মনে করছেন।

মে দিবস পালিত হয় ‘আট ঘণ্টা হোক শ্রম ঘণ্টা’ এই দাবিতে। কিন্তু প্রশ্ন এসে যায়– কেটে গেছে বহু বছর, অনেক প্রহর– কিন্তু নারীর আটঘণ্টা শ্রম – এ বিষয়ের কি কোনো সমাধান হয়েছে এখনো! বিশেষত অদৃশ্য শ্রমের। পারিশ্রমিক বা বিনা পারিশ্রমিকে নারীরা শ্রম দেয়– শারীরিক ও মানসিক শ্রমের পরিপ্রেক্ষিতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এখনো নারীরা ‘আধঘণ্টা শ্রমের বাইরে বিনোদন, বিশ্রাম – এই বিলাসিতা উপভোগ করতে পারে না। কারখানার নারী শ্রমিকের শোষণের ওপর মালিকের মুনাফা– কিন্তু কর্মপরিবেশ বা মজুরি কতোটা তাদের অনুকূলে! তেমনি কৃষিতে, খনিতে, পর্যটন শিল্পে বা চা বাগানে বা ইটভাঙায়সহ বিভিন্ন খাতে নানাভাবে শোষিত।

২০১৮ সালে স্পেনের নারীরা লিঙ্গ সমতা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসানের দাবি যেমন গৃহকর্ম, কারখানার নারী শ্রমিক, স্বাস্থ্য শ্রমিকদের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, যৌন হয়রানি, গর্ভাবস্থার কারণে বৈষম্য নিরসনের দাবিতে ধর্মঘট করেছিলেন। এভাবে নারী শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় নেমেছে – যদিও এরপরেও তাদের ক্ষেত্রে বৈষম্য মোটেই কমেনি। মূখ্যত নারীরা নানা কারণে বৈষম্যের শিকার– যা ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাঁধা প্রদান করে – এ যেন কাচের ছাদ। বাংলাদেশে নারী শ্রমিকের হার কৃষিখাতে সবচেয়ে বেশি – এরপরে আছে শিল্পখাত এবং গৃহস্থালি শ্রম তথা অদৃশ্য খাতে সবচেয়ে বেশি। মে দিবসের আলোকে সকলকে ভাবতে হবে – নারীর শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নে প্রথমত যে সব নারী তাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন– তাদের জন্য সমতার ভিত্তিতে একটি সুন্দর অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।

নারী শ্রমিকেরা পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হন প্রায়শই এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। মৌখিক নোংরা কথাবার্তার অভিযোগ আসে হরহামেশাই। কিন্তু সেসব কেউ আমলে নেয়না। কয়েকটি এনজিও’র তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম ‘সজাগ কোয়ালিশন’ একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো। চারটি এলাকার আটটি কারখানার শ্রমিকের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২২ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন যে তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানি হিসেবে কারখানায় প্রবেশের সময় নিরাপত্তা কর্মীদের অস্বস্তিকরভাবে দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা, সম্পর্ক তৈরি না করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন – এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে ঐ প্রতিবেদনে।

এছাড়াও বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি ও নির্যাতনের শিকার হন, তা বর্ণনাতীত। বিশেষ করে সৌদি আরবে প্রায়ই নারীরা নির্যাতিত হন। অভিবাসন সম্পর্কে গত প্রায় ৩০/৩২ বছরের হিসেবে, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে এই সময়কালে নারী শ্রমিকদের ৪০ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি এ বিষয়ে আলোচনা করলেও তাদের ভাগ্য বদলাতে এখনো কোনো কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় আয়ে নারীর অবদান ৩০ ভাগ। বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী বিশ্বের মোট নারীর ৪৫ ভাগ অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় নারীদের উল্লেখযোগ্য অবদান ও ভূমিকা এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। উল্লেখ্য, লোকায়ত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও লোকজ চিকিৎসা নারীদের দ্বারাই সংগৃহীত ও সঞ্চারিত হয়। বিশ্বে সর্বত্র প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মে দিবসের চেতনা কি বাস্তবায়ন সম্ভব? কারণ একে তো শ্রমিকদের কম বেতন দেওয়া হয়। তার মধ্যে তাদের প্রাপ্য বেতনভাতা ও বোনাস মালিকপক্ষ পরিশোধ করে না। শ্রমিক বলতে নারী-পুরুষ উভয়ইকে বোঝালেও নারী শ্রমিকেরা আরও প্রান্তিক অবস্থানে আছে। বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ (তৃতীয় প্রান্তিক) থেকে জানা যায়, দেশের শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের মোট অংশগ্রহণ (১৩তম আইসিএলএস অনুয়ায়ী) ৫৭ দশমিক ৬৬। এর মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৭৯ দশমিক ৩৫ আর নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৬ দশমিক ৬১। আবার ১৯তম আইসিএলএস অনুয়ায়ী শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের মোট অংশগ্রহণ ৪৮ দশমিক ৭০। এর মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৭৮ দশমিক ৫৮ আর নারীর অংশগ্রহণের হার ১৯ দশমিক ৭। এই পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই ধারণা করা যায়, শ্রমশক্তিতে নারীদের অবস্থান কতটা পিছিয়ে রয়েছে।

প্রায় আড়াই দশক ধরে দেশে রফতানি আয়ে নারীর অবদান সবচেয়ে বেশি। কেননা, এ দেশের বৈদেশিক ৭৫ ভাগ আসে পোশাকশিল্প খাত থেকে। যে খাতে প্রায় ৮০ ভাগই নারী শ্রমিক, প্রায় ১২ লাখ নারী এখন এ খাতে নিয়োজিত। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী অন্যান্য রফতানিমুখী শিল্প খাতের অধিকাংশ শ্রমিক নারী। নির্মাণশিল্পসহ নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান রাজনীতি ও নারীর দীপ্ত পদচারণা গণতন্ত্রকে আরো সুদৃঢ় করছে।

( লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন)


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com