না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষা সৈনিক, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। ৮৩ বছর বয়সে বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে বন্ধু মহলে ‘কারাগারের পাখি’ খ্যাত এই রাজনীতিক চিরবিদায় নেন (ইন্না লিল্লাহি… রাজিউন)।
বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ১৯৩৯ সালের ১০ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলার দোগাছি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক।
অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ১৯৫৪ সালে ঢাকার সেন্টগ্রেগরিজ হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক এবং ১৯৫৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন।
এরপর তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে বি এ পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই এম এ ও এল এল বি পাস করেন তিনি।
বহু আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া এই নেতা ১৯৫২ সালে নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গুরুতর আহতাবস্থায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তার ঠিকানা ছিল মূলত কারাগার। বন্ধু মহলে কারাগারের পাখি বলে পরিচিত শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ৭৮ বছরের জীবনে অন্তত ২০ বছর জেল খেটেছেন।
ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও তিনবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করে এদেশে অনেক প্রথিতযশা রাজনীতিক তৈরি করেছেন।
১৯৬৬ সালের ছয়দফা ও ১৯৬৯ সালের এগারো দফার অন্যতম রূপকার শাহ মোয়াজ্জেম মহান মুক্তিযুদ্ধেরও অন্যতম সংগঠক। তিনি স্বাধীনতার স্বপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টে টানা আড়াই ঘণ্টা ভাষণ দেন। নিজ হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা সে সময়ের জাতীয় নেতাদের মধ্যে অন্যতম শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।
১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রবীণ এই রাজনীতিক। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো চিফ হুইপ নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর দ্বিতীয়বারের মতো চিফ হুইপ নির্বাচিত হন শাহ মোয়াজ্জেম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আশির দশকে শাহ মোয়াজেম হোসেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব, এরশাদ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ উপনেতা ও উপ প্রধানমন্ত্রী হন।
বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর ভাইস চেয়ারম্যান পদ দেওয়া হয়। আমৃত্যু এই পদেই তিনি ছিলেন। যদিও তাকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য করার আলোচনা ছিলো দলের ভেতরে-বাইরে। শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। যা নিয়ে নিজের মধ্যেও ক্ষোভ ছিলো তার।
এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিজ নির্বাচনী এলাকা মুন্সীগঞ্জ থেকে বিকল্পধারার মুখপাত্র মাহি বি চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন শাহ মোয়াজ্জেম। এরপরে রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি স্ত্রীর মৃত্যুতেও নিজে ভেঙে পড়েন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভোগা এই মানুষটি। ফলে অনেকদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি তাকে। তবে মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে নানা ইস্যুতে বক্তব্য দিতেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে শাহ মোয়াজ্জেম একজন সুলেখকও বটে। ‘নিত্য কারাগারে’, ‘বলেছি বলছি বলবো’, ‘ছাব্বিশ সেল’, ‘জেল হত্যা মামলা’সহ তার ডজনখানেক বই প্রকাশ হয়েছে।












