জনতার আওয়াজ ডেস্ক
গুপ্ত বন্দিশালা আয়নাঘরের অন্তরাল থেকে ফিরেছেন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। দীর্ঘ আট বছর গুম থাকার পর গত সাত আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পর এই প্রথম সাংবাদিকদের সামনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত কেন্দ্রীয় আমির গোলাম আযম পুত্র। গুম করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে দুইটা কারণে আটকে রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো, আমার পৈতৃক পরিচয় এবং আমি ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। আমি সব প্রতিবেশি বন্ধু চাই। যে বন্ধু আমার ক্ষতি করে তাকে শত্রু ছাড়া আমি বন্ধু ভাবতে পারি না। ভারত যতদিন বন্ধুসুলভ আচরণ করবে ততদিন আমি বুকে জড়িয়ে ধরবো, ভারত যদি শত্রুর মত আচরণ করে তাহলে আমি তাকে শত্রুই ভাববো এবং শত্রু বলে যাবো। গুপ্ত বন্দী সালাতে থাকাকালীন আমাকে একজন বলেছে, আপনি বিদেশী শক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। এই কারণে আমাকে বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে আপনি ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার কেন।
মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন৷
দীর্ঘ বন্দিজীবনে থাকাবস্থায় দাঁত, চোখসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। সেই সুবাধে রাধানীতির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই হাসপাতাল থেকেই যুক্ত হন সংবাদ সন্মেলনে। যুক্ত হয়েই তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ, আহত ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের যারা আহত, নিহত হয়েছেন তাদের প্রতি শোক, কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে শহিদে প্রকৃত সংখ্যা ও জাতীয় সংগীতের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন। দাবি তোলেন জাতীয় সংগীত ও সংবিধান পরিবর্তনের৷
তিনি বলেন, আমি এ জাতীয় সংগীত এই সরকারের উপর ছেড়ে দিলাম। আমাদের এখন যে জাতীয় সংগীত রয়েছে সেটি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের পরিপন্থী। এটা দুই বাংলা এক করার জন্য বঙ্গভঙ্গ রদের সময়কে উপস্থাপন করে। যে সংগীত দুই বাংলা এক করার জন্য করা হয় সেটা কিভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হতে পারে? এই সংগীত ১৯৭১ সালে ভারত আমাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছিল। জাতীয় সংগীত করার জন্য অনেক গান রয়েছে। এই সরকারের উচিত একটা নতুন কমিশন গঠন করে একটি নতুন জাতীয় সংগীত তৈরি করা উচিত।
সংবিধানে কী ধরনের পরির্তন বা সংস্কার চান? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান পরিবর্তন করা একটা বিরাট ব্যাপার। সংবিধানে মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্যায় হলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নাই, এটা বাতিল করতে হবে। মানবাধিকার পরিপন্থি যতগুলো আইন আছে সেগুলোর সব কিছু বাতিল করতে হবে। নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। এদেশের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আবেগের প্রতিফলন হতে হবে। আমাদের দেশ হচ্ছে একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এখানে প্রায় ৯০ ভাগের বেশি মুসলমান রয়েছে। মুসলমানদের আল্লাহর আইনের বিরোধী কোনো সংবিধান থাকতে পারবেনা। আমাদের সংবিধানে লেখা আছে জনগণ সার্বভৌমত্বের মালিক। কিন্তু জনগণ সার্বভৌমত্বের মালিক নয়। সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহর আইনের বিরোধী কোন আইন পাস হতে পারে না। জনগণ সার্বভৌমত্বের মালিক হতে পারে না। সুতরাং সংবিধানে একটা আইন সংযোজন করে আমাদের মুসলিম চেতনার আইন করতে হবে।
বেআইনীভাবে আটকে রাখার ব্যাপারে কোন আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোন আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করব কিনা এ বিষয়ে যদি বলি, সেনাপ্রধান নিজে একটা কমিটি করেছেন। তাদের সাথে আমার চার ঘন্টা কথা হয়েছে। অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা আামকে বলেছে, তারা সত্য উদঘাটন করবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই সেনাপ্রধান এবং সত্য উদঘাটন করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জানতে চাওয়া হয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ব্যাপারে৷ জবাবে তিনি বলেন, আমি এখনো চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছি। রাজনীতি নিয়ে আমি কারো সঙ্গে কোন আলোচনা করিনি। আমি দেশ প্রেমিক আমি দেশের জন্য কাজ করতে চাই। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ দেন এবং সাহায্য করেন।
বর্তমান সরকারকে দ্রুত নির্বাচনের জন্য চাপ না দেওয়াসহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন এবং বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাদের ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের মতো নানা পদবীতে ভূষিত করার আহবান জানিয়েছেন।
আযমির ভাষ্যমতে, ২০১৬ সালে গুমের শিকার হন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আজমের সন্তান আবদুল্লাহিল আমান আযমী। দীর্ঘ ৮ বছর পরে গত ৬ আগস্ট দিবাগত রাতে তিনি আয়না ঘর থেকে মুক্তি পেয়েছেন। সেদিন ভোরেই তাকে মুখোশধারী কয়েকজন লোক গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় টাঙ্গাইলের ঘাটাইল এলাকা থেকে। নামিয়ে দেওয়ার পর তার হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন মুখোশধারীরা। সেই টাকা তিনি ঢাকাগামী একটি বাসে উঠে এক যাত্রীর মোবাইল থেকে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ পরিবারের লোকজন তাকে ঢাকার টেকনিক্যাল মোড় থেকে বাসায় নিয়ে যান। বাসায় নেওয়ার একদিন পরে আযমি অজ্ঞান হয়ে যান৷ তারপর থেকে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদের প্রকৃত সংখ্যার নিয়ে তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান কোনো রকম জরিপ ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধের শহিদের সংখ্যা প্রকাশ করেন। একটা যুদ্ধে কত মানুষ মারা গেলেন তার কোনো সঠিক সংখ্যা জাতি এখনো জানে না।
শহিদের সংখ্যা নিয়ে একটি জরিপ হয়েছিল উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার আযমী বলেন, একটা জরিপ হয়েছিল যেখানে ২ লাখ ৮৬ হাজার শহিদের সংখ্যা জানা গেলেও শেখ মুজিবুর রহমান ৩ লাখ বলতে গিয়ে ৩ মিলিয়ন বলে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার আযমী বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত যেন নতুন করে লেখা হয়। বর্তমানে যে জাতীয় সংগীত চলছে তা করেছিল ভারত। দুই বাংলাকে একত্রিত করার জন্য এই জাতীয় সংগীত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নতুনভাবে হওয়া উচিত।
সংবাদ সন্মেলন শেষ করার আগে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, গুম-হত্যা বন্ধ করতে হবে। সুশাসন ও আইনের শাসন করতে হবে এবং জাতীয় সঙ্গীত নতুন করে নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়েছেন।












