শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
একদিকে ক্লাসের ব্যস্ততা ও সেমিস্টার পরীক্ষা, অন্যদিকে সংবাদ সংগ্রহের তাড়া– ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের জীবন যেন দ্বিমুখী চড়াই-উতরাইয়ের গল্প। একঘেয়ে এই যান্ত্রিক জীবন পেছনে ফেলে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য পেতে, একটু সজীব নিশ্বাস নিতে সিলেটের পাহাড় আর ঝরনার রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) প্রেস ক্লাবের সদস্যরা।
রাতারগুলের মায়াবী জলবন থেকে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া শীতল স্রোত–পুরো সফরটি ছিল ব্যস্ত জীবনের মাঝে এক চিলতে শান্তি খোঁজার তাড়া। পাবনা থেকে সিলেটের যাত্রাপথটা দীর্ঘ, প্রায় ১৪ ঘণ্টার। বাসের জানালার বাইরে যখন নিকষ কালো অন্ধকার রাস্তা পেছনে ছুটছিল, ভেতরে তখন বইছিল আড্ডা, গান আর হাসির জোয়ার। কেউ বলছিলেন তার জীবনের স্মৃতিকথা, আবার কেউবা শেয়ার করছিলেন পুরোনো কোনো সংবাদ কাভারেজের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
সিলেট পৌঁছে সফরের প্রথম গন্তব্য ছিল ‘বাংলার অ্যামাজন’খ্যাত রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট। সকালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় জলযোগ সেরে অটোরিকশায় যখন বনের পথে যাত্রা শুরু হলো, দুই পাশের সবুজের সমারোহ সবাইকে মুগ্ধ করছিল। রাতারগুল পৌঁছাতেই দেখা মিলল এক বিস্ময়কর জগতের। ঘাটে বাঁধা ছিল সারি সারি ছোট নৌকা। এই ছোট নৌকাগুলোতে চেপে যখন বনের গভীর অরণ্যে প্রবেশ করা হলো, চারদিকের নিস্তব্ধতা সাড়া দিয়ে উঠছিল।
হিজল-করচের ডালপালা পানির বুক চিরে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত মায়াজাল। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক গলে স্বচ্ছ পানির ওপর এসে পড়লে মনে হচ্ছিল কোনো নিপুণ শিল্পী সোনা দিয়ে জলছবি এঁকেছেন। বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর অচেনা পাখির ডাকে পরিবেশটা হয়ে উঠেছিল রহস্যময় সুন্দর। রাতারগুলের স্তব্ধতা পেছনে ফেলে পরবর্তী গন্তব্য ছিল ভোলাগঞ্জের ‘সাদা পাথর’। পথজুড়ে সঙ্গী ছিল ওপারে মেঘালয়ের আকাশচুম্বী পাহাড়।
পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনাগুলোকে দূর থেকে মনে হচ্ছিল সবুজের গায়ে লেপ্টে থাকা সাদা সুতোর মালা। সাদা পাথরে পৌঁছাতেই যেন চোখের পলক থমকে গেল! ধলাই নদীর স্বচ্ছ নীল জল আর ধবধবে সাদা পাথরগুলো রোদের আলোয় হীরার মতো জ্বলজ্বল করছিল। বরফশীতল পানি যখন পাথরের গা ছুঁয়ে বয়ে যায়, সেই দৃশ্য কোনো কবির কল্পনার চেয়েও সুন্দর। মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে কোনো ‘ডেডলাইন’ নেই, নেই কোনো ব্যস্ততা।
পরদিন গন্তব্য ছিল প্রকৃতির আরেক মায়াবী কন্যা জাফলং। ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, আর এপারের স্বচ্ছ পিয়াইন নদী– দুইয়ের মেলবন্ধন জাফলংকে দিয়েছে অনন্য রূপ। পিয়াইনের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নুড়ি পাথর আর কুয়াশামাখা পাহাড়গুলো যেন স্বপ্নের দৃশ্যপট। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা যুগের পর যুগ ধরে এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে করেছে উর্বর ও জুগিয়েছে প্রাণসঞ্চার।
সফরের শেষ অংশে ভোরে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে চেপে যাত্রা হলো চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের পথে। শ্রীমঙ্গলে পৌঁছেই ‘চাঁদের গাড়ি’তে চড়ে চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথে শুরু হলো নতুন রোমাঞ্চ। রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ চা-গাছের সবুজ মখমলে ঢাকা পাহাড়গুলো যেন ধরণীর সবুজ গালিচা। এর পর লাউয়াছড়া উদ্যানের গহীন অরণ্যে বিশাল উঁচু গাছের চাঁদোয়া মাথার ওপর শীতল ছায়া বুনে দিচ্ছিল।
রাতে শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত হোটেলে খাবারের মধ্য দিয়ে সফরের ইতি টানা হয়। এই সফর ছিল সহকর্মীদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করার মাধ্যম। পাহাড়, ঝরনা ও সাদা পাথরের সেই শীতল স্মৃতিগুলো পাবিপ্রবি প্রেস ক্লাবের তরুণ সাংবাদিকদের আগামী দিনের কর্মব্যস্ততায় প্রেরণা হয়ে থাকবে। প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে শিখিয়ে গেল–ক্লান্তি যতই আসুক, একটু সজীব নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ আমাদের চারপাশেই সুন্দরভাবে মিশে থাকে।












